হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর জীবনী ও কুরআনের আলোকে কাহিনী

হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর জীবনী ও কাহিনী—কুরআনের আলোকে তাঁর নবুওয়াত, শিক্ষা, জ্ঞান, ধৈর্য, ন্যায়পরায়ণতা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত বিশেষ মর্যাদার বিস্তারিত বিবরণ।

Aug 13, 2025 - 01:05
 0  1
হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর জীবনী ও কুরআনের আলোকে কাহিনী

প্রারম্ভিক পরিচয়

হযরত ইদ্রিস (আলাইহিস সালাম) ছিলেন আল্লাহ্‌র প্রিয় বান্দা ও নবী। কুরআনে তাঁকে “সিদ্দীক” (সত্যনিষ্ঠ) ও “নবী” হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে এবং তাঁর জন্য “উচ্চ মর্যাদা” বর্ণিত হয়েছে—যা তাঁর ঈমান, আমল ও ধৈর্যের বিশেষ স্বীকৃতি। (সূরা মারইয়াম ১৯:৫৬–৫৭; সূরা আল-আম্বিয়াঃ ২১:৮৫–৮৬)।

কুরআনে ইদ্রিস (আঃ)-এর উল্লেখ

  • সত্যনিষ্ঠ নবী: “কিতাবে ইদ্রিসের কথা স্মরণ কর; তিনি ছিলেন সত্যবাদী, নবী।” (বাংলা সারকথা; মারইয়াম ১৯:৫৬)। 

  • উচ্চ মর্যাদা: “আমি তাঁকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছি।” (বাংলা সারকথা; মারইয়াম ১৯:৫৭)। তাফসিরে এই ‘উচ্চ মর্যাদা’কে আল্লাহর অনুগ্রহে বিশেষ সম্মান/মাকাম হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। 

  • ধৈর্যের দলভুক্ত: “ইসমাঈল, ইদ্রিস ও যুলকিফল—সবাই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত।” (বাংলা সারকথা; আল-আম্বিয়া ২১:৮৫–৮৬)।

নাম, সময়কাল ও পরিচয় (সংক্ষিপ্ত)

তাফসিরগ্রন্থে ইদ্রিস (আঃ)-কে বহু আলেম ‘আদম (আঃ)-এর পরবর্তী প্রাচীন যুগের নবী’ হিসেবে উল্লেখ করেন; ইহুদি-খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের ‘এনক’ (Enoch) নামের সাথে তাঁর পরিচয়ের মিল আছে বলে কেউ কেউ বলেন, তবে কুরআন নাম ও গুণাবলি বলেই সীমাবদ্ধ থেকেছে—পরিবার/বংশের বিশদ আলোচনায় যায়নি। এ অংশে মতভেদ থাকায় আমরা কুরআনের নিশ্চিত তথ্যকেই অগ্রাধিকার দিই।

তাফসির/আসারে আলোচিত বিশেষ দিক (সতর্কতা-সহ)

কিছু প্রাচীন তাফসির ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় ইদ্রিস (আঃ) সম্পর্কে অতিরিক্ত নির্দিষ্ট তথ্য আসে—যেমন:

  • কলম ব্যবহার ও সেলাই/দর্জিগিরি: তিনি কলমে লেখা শুরু করার প্রথমদিকের মানুষদের একজন এবং সেলাই/টেইলরিংয়ের পথপ্রদর্শক—এমন বর্ণনা পাওয়া যায়। এই বর্ণনাগুলির সনদে পার্থক্য আছে; তাই ‘রেওয়ায়াত’ হিসেবেই ধরা শ্রেয়, আকীদা-হুকুমে প্রমাণ হিসেবে নয়। 

  • ইসমরা’ ও মাকাম ‘আলিয়্যা: কিছু তাফসিরে ‘উচ্চ মর্যাদা’ প্রসঙ্গে বর্ণিত—রাসূল ﷺ ইসরা-ও-মিরাজ রাতে ইদ্রিস (আঃ)-কে আসমানের এক স্তরে দেখেন—এই খবরকে ইবন কাসির প্রমুখ উল্লেখ করেছেন। (রেওয়ায়াত হিসেবে বর্ণিত)। 

কেন এই সতর্কতা?—কুরআন যেখানে নীরব, সেখানে দুর্বল/ইসরাঈলিয়াত বর্ণনার ক্ষেত্রে আলেমরা সাবধান থাকতে বলেন; শিক্ষণীয় দিক নিতে পারি, কিন্তু সেগুলোকে দৃঢ় দলিল ধরা যায় না।

চরিত্র ও গুণাবলি (কুরআনের আলোকে)

  1. সত্যনিষ্ঠা (সিদ্দিকিয়্যাহ): কথায় ও কাজে সত্যনিষ্ঠ থাকা—দাওয়াতদাতা/শিক্ষকের প্রথম গুণ। (মারইয়াম ১৯:৫৬)।

  2. ধৈর্য (সবর): দায়িত্ব, বিপদ ও সময়ের পরীক্ষায় অবিচল থাকা। (আল-আম্বিয়া ২১:৮৫)। 

  3. উচ্চ মর্যাদা: আমল ও ইখলাস আল্লাহর কাছে মর্যাদা বাড়ায়—‘উচ্চ মাকাম’-এর ইঙ্গিত। (মারইয়াম ১৯:৫৭)। 

ইদ্রিস (আঃ)-এর কাহিনীর মূল শিক্ষা

  • তাওহিদের পথে জ্ঞানচর্চা: সত্যে অবিচল থাকতে হলে ইলম দরকার—কুরআনের বর্ণনা ও তাফসিরে তাঁর জ্ঞান-প্রাধান্য বিশেষভাবে উঠে আসে (রেওয়ায়াতসমূহে কলম/জ্যোতির্বিজ্ঞান/হিসাববিদ্যার উল্লেখ আছে)। 

  • সবর ও স্ট্যামিনা: লক্ষ্য বড় হলে ধৈর্য বড় হতে হয়—‘কুল্লুম মিনা-ছ্সাবিরীন’ (তাঁরা সবাই ধৈর্যশীল)। 

  • সত্যনিষ্ঠার পুরস্কার: সত্যে অটল থাকলে আল্লাহ উচ্চ মর্যাদা দান করেন—‘রাফাআনাহু মাকানান ‘আলিয়্যাঃ’। 

  • দায়িত্বশীল নেতৃত্ব: নবী হিসেবে তাঁর কাজ ছিল মানুষকে সৎপথের দাওয়াত—সত্য বলা, অন্যায়ের প্রতিরোধ, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। (কুরআনের সমষ্টিগত নবী-নীতি; ইদ্রিসের প্রসঙ্গে ধৈর্য/সত্যনিষ্ঠা বিশেষভাবে এসেছে)। 

আজকের প্রাসঙ্গিকতা—আপনার/আমার জন্য কী শেখা?

  • স্কিল + নেক নিয়্যাত: কাজ শেখা/শিক্ষা নেওয়া ইবাদত হতে পারে—যদি উদ্দেশ্য হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের উপকার (রেওয়ায়াতে ‘কলম/সেলাই’ প্রসঙ্গ—ইলম ও পেশাকে মহৎ কাজে লাগানো)। 

  • ডিজিটাল যুগে সত্যনিষ্ঠা: তথ্যের ভিড়ে সত্যকে আঁকড়ে ধরা—ইদ্রিসীয় চরিত্রের বাস্তব অনুশীলন।

  • সাবর-স্ট্র্যাটেজি: দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে ধৈর্যের চর্চা—ছোট ধারাবাহিক পদক্ষেপ, স্থির কাজের শৃঙ্খলা।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

ইদ্রিস (আঃ)-এর নাম কুরআনে কোথায় এসেছে?—সূরা মারইয়াম ১৯:৫৬–৫৭; সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮৫–৮৬। 
‘উচ্চ মর্যাদা’—এর মানে কী?—আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও সম্মানজনক অবস্থান; তাফসিরে বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে।
তিনি কি প্রথম কলম ব্যবহারকারী ছিলেন?—কিছু তাফসির/আসারে এ বর্ণনা আছে; দলিলগত শক্তি ভিন্ন—শিক্ষণীয় রেওয়ায়াত হিসেবে দেখা উত্তম। 

উপসংহার

কুরআনে অল্প আয়াতেই হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর ‘সত্যনিষ্ঠা, ধৈর্য ও উচ্চ মর্যাদা’—এই তিন আলোর রেখা সুস্পষ্ট। সংক্ষিপ্ত পরিচিতি হলেও তাঁর জীবন আমাদের শেখায়: সত্যে অটল হও, কাজের নৈপুণ্য বাড়াও, আর ধৈর্য ধরে সৎপথে থেকো—তাহলেই আল্লাহর কাছে মর্যাদা বাড়ে। (মারইয়াম ১৯:৫৬–৫৭; আল-আম্বিয়া ২১:৮৫–৮৬)।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0