হযরত আইয়ুব (আলাইহিস সালাম) এর জীবনী

Jun 16, 2025 - 21:03
 0  0
হযরত আইয়ুব (আলাইহিস সালাম) এর জীবনী

হযরত আইয়ুব (আলাইহিস সালাম) এর জীবনী

হযরত আইয়ুব (আ.) আল্লাহর এক মহান নবী ছিলেন যিনি ধৈর্য, ত্যাগ ও সবরের এক অনন্য প্রতীক। কুরআনুল কারিমে তাঁর কাহিনি কয়েকটি স্থানে বর্ণিত হয়েছে, বিশেষ করে সূরা সাদ (আয়াত 41-44) এবং সূরা আম্বিয়া (আয়াত 83-84)-তে। তাঁর জীবনের কাহিনি মানুষের জীবনে ধৈর্য ও বিশ্বাসের অনন্য উদাহরণ।


পরিচিতি ও বংশপরিচয়

হযরত আইয়ুব (আ.) ছিলেন হযরত ইসহাক (আ.)-এর বংশধর। অধিকাংশ ইসলামি ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি হযরত ইসহাক (আ.)-এর পুত্র হযরত ইসু (আ.)-এর সন্তান ছিলেন। তাঁর পূর্ণ নাম ছিল আইয়ুব ইবনে আমোস ইবনে ইসরাঈল। তিনি বর্তমান সিরিয়া অঞ্চলের কোনো এক এলাকায় বসবাস করতেন।


জীবনের আরাম-আয়েশ ও ধন-সম্পদ

হযরত আইয়ুব (আ.) এক সময় ছিলেন এক ধনবান ব্যক্তি। তাঁর ছিল—

  • বহু জমি-জমা ও গবাদি পশু

  • বহু দাস-দাসী

  • সুন্দর, সৎ ও নেককার স্ত্রী

  • বহু সন্তান

তাঁর মধ্যে ছিল বিনয়, ধৈর্য, দানশীলতা ও আল্লাহর প্রতি গভীর ভক্তি। তিনি সম্পদ থাকা অবস্থাতেই সবসময় আল্লাহর শোকর করতেন।


পরীক্ষা ও বিপদের সূচনা

আল্লাহ তাআলা তাঁর ঈমানের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য তাঁর ওপর বিভিন্ন বিপদ আপতিত করেন। একে একে তিনি হারান—

  • সব গবাদি পশু

  • সব জমি-জমা ও সম্পদ

  • সব সন্তান

  • নিজ শরীরে ভয়ানক রোগ হয়, যা প্রায় ১৮ বছর ছিল (কিছু বর্ণনায় ৭ বছর)

  • সমাজের মানুষ তাঁকে একঘরে করে, এমনকি আত্মীয়স্বজনও তাকে পরিত্যাগ করে

  • স্ত্রী ব্যতীত কেউ তাঁর সেবা করত না

তাঁর দেহ এমন রোগে আক্রান্ত হয় যে, তার রূপ ও গঠন বিকৃত হয়ে যায়। অনেকে মনে করত, তার এই রোগ সংক্রামক।


ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস

হযরত আইয়ুব (আ.) কখনও আল্লাহর প্রতি হতাশ হননি। তিনি কেবল আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, যেমন কুরআনে এসেছে:

“আর স্মরণ কর আইয়ুবকে, যখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিল: ‘নিশ্চয়ই আমি দুঃখে পতিত হয়েছি এবং আপনি তো পরম দয়ালু।’”
(সূরা আম্বিয়া: ৮৩)

এই দোয়ার মাধ্যমে তিনি রোগমুক্তির জন্য নয়, বরং আল্লাহর রহমত কামনা করেছিলেন।


আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তি ও পুরস্কার

আল্লাহ তাঁর ধৈর্য ও বিশ্বাসের পুরস্কার স্বরূপ তাঁর সবকিছু ফিরিয়ে দেন। কুরআনে এসেছে:

“অতঃপর আমি তার দোয়া কবুল করলাম, যা তার দুঃখ ছিল তা দূর করে দিলাম এবং তার পরিবারবর্গকে ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সঙ্গে আরো ততসংখ্যক দিলাম—আমার নিকট থেকে অনুগ্রহস্বরূপ ও উপাসনাকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ।”
(সূরা আম্বিয়া: ৮৪)

আল্লাহ তাঁকে বলেন:

“আপনি আপনার পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত করুন। এটি ঠাণ্ডা পানি, গোসল ও পান করার উপযোগী।”
(সূরা সাদ: ৪২)

এই পানির মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান।


স্ত্রীর ধৈর্য ও নিঃস্বার্থতা

তাঁর স্ত্রী ছিলেন ধৈর্যশীলা ও পরিপূর্ণ এক মুমিনা নারী। তিনিই একমাত্র ছিলেন, যিনি এত কষ্টেও আইয়ুব (আ.)-কে ছেড়ে যাননি। তিনি কাজ করে উপার্জন করতেন, এবং সেই অর্থ দিয়ে আইয়ুব (আ.)-এর সেবা করতেন।


হিকমত ও শিক্ষা

হযরত আইয়ুব (আ.)-এর জীবনী থেকে আমরা যে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই তা হলো:

  1. বিপদে ধৈর্য ও সবরের গুরুত্ব

  2. আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও নির্ভরতা

  3. কঠিনতম পরীক্ষায়ও নিরাশ না হয়ে, ধৈর্য অবলম্বন করা

  4. আল্লাহ কখনো ধৈর্যশীলদের পুরস্কার দিতে ভুল করেন না


শেষ কথা

হযরত আইয়ুব (আ.)-এর জীবনী মানবজাতির জন্য এক অতুলনীয় আদর্শ। তাঁর ধৈর্য ও ইমানের শক্তি সত্যিই অভাবনীয়। মুসলমানদের উচিত, জীবনের কঠিন মুহূর্তে তাঁর জীবনী থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0