হযরত আইয়ুব (আলাইহিস সালাম) এর জীবনী
হযরত আইয়ুব (আলাইহিস সালাম) এর জীবনী
হযরত আইয়ুব (আ.) আল্লাহর এক মহান নবী ছিলেন যিনি ধৈর্য, ত্যাগ ও সবরের এক অনন্য প্রতীক। কুরআনুল কারিমে তাঁর কাহিনি কয়েকটি স্থানে বর্ণিত হয়েছে, বিশেষ করে সূরা সাদ (আয়াত 41-44) এবং সূরা আম্বিয়া (আয়াত 83-84)-তে। তাঁর জীবনের কাহিনি মানুষের জীবনে ধৈর্য ও বিশ্বাসের অনন্য উদাহরণ।
✅ পরিচিতি ও বংশপরিচয়
হযরত আইয়ুব (আ.) ছিলেন হযরত ইসহাক (আ.)-এর বংশধর। অধিকাংশ ইসলামি ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি হযরত ইসহাক (আ.)-এর পুত্র হযরত ইসু (আ.)-এর সন্তান ছিলেন। তাঁর পূর্ণ নাম ছিল আইয়ুব ইবনে আমোস ইবনে ইসরাঈল। তিনি বর্তমান সিরিয়া অঞ্চলের কোনো এক এলাকায় বসবাস করতেন।
✅ জীবনের আরাম-আয়েশ ও ধন-সম্পদ
হযরত আইয়ুব (আ.) এক সময় ছিলেন এক ধনবান ব্যক্তি। তাঁর ছিল—
-
বহু জমি-জমা ও গবাদি পশু
-
বহু দাস-দাসী
-
সুন্দর, সৎ ও নেককার স্ত্রী
-
বহু সন্তান
তাঁর মধ্যে ছিল বিনয়, ধৈর্য, দানশীলতা ও আল্লাহর প্রতি গভীর ভক্তি। তিনি সম্পদ থাকা অবস্থাতেই সবসময় আল্লাহর শোকর করতেন।
✅ পরীক্ষা ও বিপদের সূচনা
আল্লাহ তাআলা তাঁর ঈমানের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য তাঁর ওপর বিভিন্ন বিপদ আপতিত করেন। একে একে তিনি হারান—
-
সব গবাদি পশু
-
সব জমি-জমা ও সম্পদ
-
সব সন্তান
-
নিজ শরীরে ভয়ানক রোগ হয়, যা প্রায় ১৮ বছর ছিল (কিছু বর্ণনায় ৭ বছর)
-
সমাজের মানুষ তাঁকে একঘরে করে, এমনকি আত্মীয়স্বজনও তাকে পরিত্যাগ করে
-
স্ত্রী ব্যতীত কেউ তাঁর সেবা করত না
তাঁর দেহ এমন রোগে আক্রান্ত হয় যে, তার রূপ ও গঠন বিকৃত হয়ে যায়। অনেকে মনে করত, তার এই রোগ সংক্রামক।
✅ ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস
হযরত আইয়ুব (আ.) কখনও আল্লাহর প্রতি হতাশ হননি। তিনি কেবল আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, যেমন কুরআনে এসেছে:
“আর স্মরণ কর আইয়ুবকে, যখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিল: ‘নিশ্চয়ই আমি দুঃখে পতিত হয়েছি এবং আপনি তো পরম দয়ালু।’”
— (সূরা আম্বিয়া: ৮৩)
এই দোয়ার মাধ্যমে তিনি রোগমুক্তির জন্য নয়, বরং আল্লাহর রহমত কামনা করেছিলেন।
✅ আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তি ও পুরস্কার
আল্লাহ তাঁর ধৈর্য ও বিশ্বাসের পুরস্কার স্বরূপ তাঁর সবকিছু ফিরিয়ে দেন। কুরআনে এসেছে:
“অতঃপর আমি তার দোয়া কবুল করলাম, যা তার দুঃখ ছিল তা দূর করে দিলাম এবং তার পরিবারবর্গকে ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সঙ্গে আরো ততসংখ্যক দিলাম—আমার নিকট থেকে অনুগ্রহস্বরূপ ও উপাসনাকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ।”
— (সূরা আম্বিয়া: ৮৪)
আল্লাহ তাঁকে বলেন:
“আপনি আপনার পা দিয়ে ভূমিতে আঘাত করুন। এটি ঠাণ্ডা পানি, গোসল ও পান করার উপযোগী।”
— (সূরা সাদ: ৪২)
এই পানির মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান।
✅ স্ত্রীর ধৈর্য ও নিঃস্বার্থতা
তাঁর স্ত্রী ছিলেন ধৈর্যশীলা ও পরিপূর্ণ এক মুমিনা নারী। তিনিই একমাত্র ছিলেন, যিনি এত কষ্টেও আইয়ুব (আ.)-কে ছেড়ে যাননি। তিনি কাজ করে উপার্জন করতেন, এবং সেই অর্থ দিয়ে আইয়ুব (আ.)-এর সেবা করতেন।
✅ হিকমত ও শিক্ষা
হযরত আইয়ুব (আ.)-এর জীবনী থেকে আমরা যে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই তা হলো:
-
বিপদে ধৈর্য ও সবরের গুরুত্ব
-
আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও নির্ভরতা
-
কঠিনতম পরীক্ষায়ও নিরাশ না হয়ে, ধৈর্য অবলম্বন করা
-
আল্লাহ কখনো ধৈর্যশীলদের পুরস্কার দিতে ভুল করেন না
✅ শেষ কথা
হযরত আইয়ুব (আ.)-এর জীবনী মানবজাতির জন্য এক অতুলনীয় আদর্শ। তাঁর ধৈর্য ও ইমানের শক্তি সত্যিই অভাবনীয়। মুসলমানদের উচিত, জীবনের কঠিন মুহূর্তে তাঁর জীবনী থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0