মাইকেল মধুসূদন দত্ত: বাংলা সনেটের প্রবর্তক এবং ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্যের রচয়িতা

Feb 8, 2026 - 13:49
 0  0
মাইকেল মধুসূদন দত্ত: বাংলা সনেটের প্রবর্তক এবং ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্যের রচয়িতা

মাইকেল মধুসূদন দত্ত: বাংলা সনেটের প্রবর্তক এবং ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্যের রচয়িতা

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী নাম। তিনি শুধু একজন কবি নন, বাংলা কাব্যভাষার এক বিপ্লবী রূপান্তরকারী। পাশ্চাত্য সাহিত্যরীতি, ছন্দ ও কাঠামোকে বাংলা ভাষায় সৃজনশীলভাবে প্রয়োগ করে তিনি বাংলা কবিতাকে এক নতুন আধুনিক ধারায় নিয়ে আসেন। বাংলা সনেটের প্রবর্তক হিসেবে এবং ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর স্রষ্টা হিসেবে তাঁর অবদান অনন্য।

তাঁর জীবন ছিল নাটকীয় উত্থান, দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত, সৃজনশীল সাফল্য এবং ব্যক্তিগত সংগ্রামে ভরা। ভাষা, ধর্ম, সাহিত্যরীতি এবং জীবনদর্শনে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী। বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে সংযোগ ঘটানোর ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত।


জন্ম ও শৈশব

মাইকেল মধুসূদন দত্ত জন্মগ্রহণ করেন ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি, যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে।

  • পিতা: রাজনারায়ণ দত্ত, একজন আইনজীবী

  • মাতা: জাহ্নবী দেবী

শৈশব থেকেই তিনি মেধাবী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ ছিল।


শিক্ষা জীবন

তিনি কলকাতার হিন্দু কলেজে পড়াশোনা করেন, যা সে সময় আধুনিক শিক্ষার কেন্দ্র ছিল। সেখানে তিনি ইংরেজি সাহিত্য, গ্রিক রোমান পুরাণ এবং পাশ্চাত্য কাব্যধারার সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হন। শেক্সপিয়র, মিল্টন, হোমার প্রমুখ লেখকের প্রভাব তাঁর লেখায় স্পষ্ট।

প্রথম জীবনে তিনি ইংরেজি ভাষায় কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছিলেন এবং ইংরেজিতে কবিতা রচনাও করেন।


ধর্মান্তর ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত

১৮৪৩ সালে তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং নামের সঙ্গে “মাইকেল” যুক্ত করেন। এই সিদ্ধান্ত পরিবার ও সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর ফলে পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং আর্থিক সহায়তাও বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর জীবনের এই অধ্যায় ছিল অত্যন্ত সংগ্রামময়।


সাহিত্যজীবনের মোড়

প্রথমে ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চা করলেও পরে তিনি উপলব্ধি করেন যে মাতৃভাষা বাংলায় লেখালেখির মধ্যেই তাঁর প্রকৃত শক্তি নিহিত। তখন থেকেই বাংলা সাহিত্যে তাঁর অসাধারণ অবদান শুরু হয়।

তিনি বাংলা কাব্যে যে নতুনত্ব আনেন:

  • অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন

  • মহাকাব্যিক রচনাশৈলী

  • পাশ্চাত্য নাট্যরীতির প্রয়োগ

  • বাংলা সনেটের সূচনা


মেঘনাদবধ কাব্য

‘মেঘনাদবধ কাব্য’ তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এবং বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য মহাকাব্য। এখানে তিনি রামায়ণের কাহিনি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেন। রাবণের পুত্র মেঘনাদকে বীর চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়, যা প্রচলিত ধারার বিপরীত।

এই কাব্যের বৈশিষ্ট্য:

  • অমিত্রাক্ষর ছন্দের শক্তিশালী ব্যবহার

  • নায়ক চরিত্রের পুনর্নির্মাণ

  • মহাকাব্যিক বর্ণনা ও নাটকীয়তা

  • পাশ্চাত্য মহাকাব্যের প্রভাব

এই রচনা বাংলা কাব্যের গঠন ও বিষয়বস্তুকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।


বাংলা সনেটের প্রবর্তন

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে সনেট রচনার সূচনা করেন। তাঁর “চতুর্দশপদী কবিতাবলী” বাংলা সনেটের প্রথম সফল সংকলন হিসেবে স্বীকৃত।

বাংলা সনেটে তিনি:

  • ইতালীয় ও ইংরেজি সনেট কাঠামো ব্যবহার করেন

  • ব্যক্তিগত বেদনা, দেশপ্রেম ও স্মৃতিচারণ তুলে ধরেন

  • ভাষায় সুর ও ভাবের ঘনত্ব আনেন


নাটক ও অন্যান্য রচনা

কবিতা ছাড়াও তিনি নাটক ও প্রহসন রচনা করেন। উল্লেখযোগ্য রচনা:

  • শর্মিষ্ঠা

  • কৃষ্ণকুমারী

  • বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ

  • একেই কি বলে সভ্যতা

এসব রচনায় ব্যঙ্গ, নাটকীয়তা এবং সামাজিক সমালোচনা দেখা যায়।


জীবনের শেষ পর্ব ও মৃত্যু

জীবনের শেষভাগে তিনি আর্থিক সংকটে পড়েন। বিদেশে আইন পড়তে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হন। দেশে ফিরে জীবনের শেষ সময় কষ্টের মধ্যে কাটান।
তিনি ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।


সাহিত্যিক গুরুত্ব

মাইকেল মধুসূদন দত্তের অবদান বাংলা সাহিত্যে যুগান্তকারী:

  • বাংলা মহাকাব্যের আধুনিক রূপদান

  • অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন

  • বাংলা সনেটের সূচনা

  • পাশ্চাত্য রীতির সৃজনশীল প্রয়োগ

তিনি দেখিয়েছেন বাংলা ভাষাও বিশ্বমানের কাব্যধারা বহন করতে সক্ষম।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0