হযরত নূহ (আঃ)-এর জীবনী ও শিক্ষণীয় কাহিনী

হযরত নূহ (আঃ) একজন মহাপ্রাণ বিপ্লবী নবী, যিনি প্রায় ৯৫০ বছর মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। তাঁর জীবনী থেকে আমাদের শেখা যায় ধৈর্য, অবিচল বিশ্বাস ও আল্লাহর অনুগ্রহে নিরন্তর চেষ্টা।

Aug 13, 2025 - 01:22
 0  1
হযরত নূহ (আঃ)-এর জীবনী ও শিক্ষণীয় কাহিনী

প্রারম্ভিক পরিচয়

হযরত নূহ (আঃ) ইসলামের ইতিহাসে প্রথম রাসূল হিসেবে সুপরিচিত। তিনি আদম (আঃ)-এর প্রায় দশ প্রজন্ম পর জন্মগ্রহণ করেন এবং আল্লাহ তাঁকে তাঁর কওমের প্রতি দাওয়াত দেওয়ার জন্য মনোনীত করেন। কুরআনে তাঁর নাম ৪৩ বার এসেছে এবং তাঁর জীবনের ঘটনা সূরা নূহ, সূরা হূদ, সূরা আনকাবূত, সূরা মুমিনূন, সূরা ক্বামারসহ একাধিক সূরায় বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
নূহ (আঃ)-এর যুগে মানুষ তাওহীদের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়েছিল। তারা “ওদ”, “সুয়া”, “ইয়াগুস”, “ইয়াউক” এবং “নাসর” নামে পাঁচটি মূর্তি পূজা করত (সূরা নূহ: ২৩)। এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য আল্লাহ নূহ (আঃ)-কে নবুওয়তের দায়িত্ব প্রদান করেন।


নবুওয়তের সূচনা ও দাওয়াতের আহ্বান

আল্লাহ নূহ (আঃ)-কে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে তাওহীদের আহ্বান জানানোর জন্য প্রেরণ করলেন। তিনি প্রথমে তাঁর নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করলেন এবং বললেন:

"হে আমার কওম! আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো উপাস্য নেই। আমি তোমাদের জন্য এক মহা দিনের শাস্তির আশঙ্কা করছি।"
(সূরা আল-আ’রাফ: ৫৯)

নূহ (আঃ) দাওয়াতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ধৈর্যশীল ছিলেন। তিনি কখনো একাকী, কখনো গোপনে, আবার কখনো জনসম্মুখে মানুষকে আহ্বান করতেন। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন, শির্ক ত্যাগ এবং সৎপথে ফিরে আসার আহ্বান ছিল তাঁর মূল বক্তব্য।


মানুষের প্রতিক্রিয়া

নূহ (আঃ)-এর দাওয়াতে অধিকাংশ মানুষ ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। বরং ধনী ও প্রভাবশালীরা তাঁকে উপহাস করত এবং তাঁকে সাধারণ একজন মানুষ বলে অবমূল্যায়ন করত। তারা বলত:

"আমরা দেখি, তুমি কেবল আমাদের মতো একজন মানুষ এবং তোমার অনুসারীরা হলো আমাদের মধ্যে নীচু শ্রেণীর লোক। আমরা তোমাদের মধ্যে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব দেখি না, বরং তোমাদের মিথ্যাবাদী মনে করি।"
(সূরা হূদ: ২৭)

তারা নূহ (আঃ)-এর দাওয়াতকে অবহেলা করে বলত, “তুমি আমাদের উপাস্যদের বিরুদ্ধে কথা বলছ, তাই যদি সত্যবাদী হও, তবে শাস্তি নিয়ে এসো।” (সূরা হূদ: ৩২)


৯৫০ বছরের দাওয়াত ও ধৈর্য

নূহ (আঃ) প্রায় ৯৫০ বছর তাঁর কওমকে আহ্বান জানিয়েছেন (সূরা আনকাবূত: ১৪)। এই দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দিন-রাত অবিরাম দাওয়াত দিয়েছেন। কিন্তু অল্প কয়েকজন ছাড়া কেউ ঈমান আনেনি। তিনি কওমকে বোঝাতেন:

"তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নদী প্রবাহিত করবেন।"
(সূরা নূহ: ১০-১২)


আল্লাহর নির্দেশ: নৌকা নির্মাণ

যখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে অধিকাংশ মানুষ কখনো ঈমান আনবে না, তখন আল্লাহ নূহ (আঃ)-কে ওহি দিলেন:

"তোমার কওমের মধ্যে যারা ইতিমধ্যে ঈমান এনেছে তাদের ছাড়া আর কেউ ঈমান আনবে না। সুতরাং তাদের কৃতকর্মের জন্য তুমি দুঃখ করো না। আমার তত্ত্বাবধানে এবং নির্দেশে তুমি নৌকা তৈরি করো।"
(সূরা হূদ: ৩৬-৩৭)

নূহ (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে একটি বিশাল কাঠের নৌকা তৈরি করতে শুরু করলেন। কাফেররা তাঁকে উপহাস করত, বলত—“শুষ্ক স্থলে নৌকা বানাচ্ছে পাগল!” কিন্তু তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি।


মহাপ্লাবনের সূচনা

যখন আল্লাহর নির্ধারিত সময় এলো, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে মহাপ্লাবনের নির্দেশ হল। আকাশ থেকে প্রবল বৃষ্টি এবং ভূমি থেকে পানি উথলে পড়ল। কুরআনে এসেছে:

"অতঃপর আমি আকাশের দরজা খুলে দিলাম স্রোতের ন্যায় প্রবাহিত পানির জন্য এবং পৃথিবীকে উদ্গীরণ করালাম উথলে ওঠা পানি দ্বারা। উভয় পানি মিলিত হলো নির্ধারিত বিষয়ের জন্য।"
(সূরা ক্বামার: ১১-১২)

নূহ (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে প্রত্যেক প্রাণীর এক জোড়া এবং মুমিনদের নৌকায় উঠালেন।


পুত্রের করুণ পরিণতি

নূহ (আঃ)-এর একটি পুত্র (কানআন) ঈমান আনেনি। প্লাবনের সময় নূহ (আঃ) তাকে নৌকায় উঠতে বললেন, কিন্তু সে বলল, “আমি পাহাড়ে আশ্রয় নেব।” তখন নূহ (আঃ) বললেন, “আজ আল্লাহর আদেশ ছাড়া কেউ রক্ষা পাবে না।” ঢেউ এসে তাকে ডুবিয়ে দিল।
আল্লাহ নূহ (আঃ)-কে বললেন:

"হে নূহ! সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়। নিশ্চয়ই সে অসৎ কাজ করেছে।"
(সূরা হূদ: ৪৬)


প্লাবনোত্তর জীবন

পানি কমে গেলে নৌকা জূদী পাহাড়ে স্থির হল (সূরা হূদ: ৪৪)। এরপর নূহ (আঃ) এবং তাঁর সঙ্গীরা নতুন জীবন শুরু করলেন। ইসলামী বর্ণনা অনুসারে, প্লাবনের পর মানবজাতি নূহ (আঃ) ও তাঁর সন্তানদের মাধ্যমেই বিস্তার লাভ করে।


নূহ (আঃ)-এর দোয়া

প্লাবনের পূর্বে নূহ (আঃ) আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন:

"হে আমার রব! অবিশ্বাসীদের একজনকেও পৃথিবীতে রেখে দিও না।"
(সূরা নূহ: ২৬)

এছাড়া তিনি মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন:

"হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যারা আমার ঘরে ঈমান নিয়ে প্রবেশ করেছে তাদের, এবং সব মুমিন পুরুষ ও নারীদের ক্ষমা করো।"
(সূরা নূহ: ২৮)


শিক্ষণীয় বিষয়

হযরত নূহ (আঃ)-এর জীবনী থেকে আমরা যে শিক্ষাগুলো পাই:

  1. ধৈর্য ও অবিচলতা – দীর্ঘ সময় দাওয়াতের পরেও হতাশ না হওয়া।

  2. আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস – বিপদে, কষ্টে ও উপহাসের মধ্যেও আস্থার অভাব না রাখা।

  3. সতর্কতা প্রদান – সৎপথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কখনো থামানো যাবে না।

  4. আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা – যুক্তি না পেলেও আল্লাহ যা আদেশ করেন তা পালন করা।

  5. পরিবারের ব্যাপারে ন্যায় – পুত্র ঈমান না আনার পরও আল্লাহর ফয়সালায় রাজি হওয়া।

  6. সতর্কবার্তার গুরুত্ব – মানুষের জন্য আগে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া।


উপসংহার

হযরত নূহ (আঃ) শুধু একজন নবীই নন, বরং ধৈর্য, তাওয়াক্কুল এবং আল্লাহর নির্দেশে অবিচল থাকার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবনের কাহিনী আজও মুসলিম উম্মাহকে শিক্ষা দেয়—যত বাধাই আসুক না কেন, সত্যের পথে অবিচল থাকতে হবে এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখতে হবে।

"নিশ্চয়ই এ কাহিনীতে শিক্ষা রয়েছে চিন্তাশীলদের জন্য।"
(সূরা ইউসুফ: ১১১)

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0