হযরত রাবেয়া বসরী (রহঃ) – জীবনী

হযরত রাবেয়া বসরী (রহঃ) – জীবনী

Jun 14, 2025 - 23:48
 0  0

বিষয়ের নাম বিবরণ
পূর্ণ নাম রাবেয়া আল-আদাবিয়া
উপাধি রাবেয়া বসরী, বসরার সাধ্বী
জন্ম আনুমানিক ৭১৩ খ্রিস্টাব্দ (৯৫ হিজরি), বসরা, ইরাক
জাতীয়তা আরব
ধর্ম ইসলাম
মাযহাব / দৃষ্টিভঙ্গি সুফি (তাসাউফ/আধ্যাত্মিক সাধনা)
শৈশব দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারে জন্ম, দাসত্বের শিকার হয়েছিলেন
পরিবার গরিব মুসলিম পরিবার, ছিলেন চতুর্থ কন্যা
দাসত্ব জীবন এক দুর্ভিক্ষকালে দাসী হিসেবে বিক্রি হন
মুক্তি মালিক এক অলৌকিক দৃশ্য দেখে তাকে মুক্ত করে দেন
আধ্যাত্মিক সাধনা আল্লাহর প্রেমে ইবাদত ও ধ্যানেই জীবন উৎসর্গ করেন
জীবনদর্শন নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহর ইবাদত; জান্নাত বা জাহান্নামের আশঙ্কা নয়, কেবল প্রেম
বিখ্যাত উক্তি "আমি যদি আল্লাহকে জান্নাতের আশায় ইবাদত করি, তবে তা থেকে বঞ্চিত করো..."
বিবাহ আজীবন অবিবাহিত; নিজেকে আল্লাহর প্রেমে বিলীন করেন
অনুপ্রেরণা ও প্রভাব সুফি চিন্তাধারার প্রভাব বিস্তার করেন; হাসান বসরীসহ বহু আউলিয়ার অনুপ্রেরণা
মৃত্যু আনুমানিক ৮০১ খ্রিস্টাব্দ (১৮৫ হিজরি), বসরা, ইরাক
দাফনস্থল বসরা, ইরাক
উত্তরাধিকার ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম প্রধান নারী আউলিয়া ও সুফি সাধ্বী

👶 জন্ম ও শৈশব:

রাবেয়া বসরী জন্মগ্রহণ করেন ইরাকের বসরা শহরে এক গরিব মুসলিম পরিবারে। তিনি ছিলেন তার পিতামাতার চতুর্থ কন্যা। পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে অনেক কষ্টের মধ্যে তাঁর শৈশব কেটেছে। বলা হয়, এক রাতে তাঁর পিতা এক স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখেন, যিনি তাঁকে বলেন, “তোমার কন্যা আল্লাহর একজন প্রিয় বান্দি হবেন।”

কিছুদিন পর তাঁর বাবা-মা মারা যান, এবং দুর্ভিক্ষের সময় তিনি গৃহহীন হয়ে পড়েন। একদিন অপহরণকারীরা তাঁকে ধরে নিয়ে দাসী হিসেবে বিক্রি করে দেয়। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবন সংগ্রামের নতুন অধ্যায়।


🔹 আধ্যাত্মিক জীবন ও সাধনা:

রাবেয়া বসরী ছিলেন এক মহান ওলি। তিনি আল্লাহর প্রেমে এতটাই ডুবে ছিলেন যে, ইবাদতের জন্যই তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। দাসত্বে থাকাকালীনও তিনি আল্লাহর ইবাদতে অতিমাত্রায় মগ্ন থাকতেন। এক রাতে তাঁর মালিক দেখেন, রাবেয়া নামাজে লিপ্ত, আর তাঁর মাথার ওপর বাতির মতো আলো ঝলমল করছে। এই অলৌকিক ঘটনা দেখে তাঁর মন পরিবর্তন হয় এবং তিনি রাবেয়াকে মুক্তি দিয়ে দেন।

এরপর রাবেয়া একাকী জীবনযাপন শুরু করেন। তিনি বৈরাগ্য অবলম্বন করে শুধুই ইবাদত-ভক্তিতে মনোনিবেশ করেন। দিনের বেশিরভাগ সময় নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও ধ্যান-মধ্যেই অতিবাহিত করতেন।


❤️ আল্লাহর প্রতি প্রেম:

রাবেয়া বসরীর সুফিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল একেবারেই আলাদা। তিনি আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও প্রেমের মাধ্যমে সাধনায় নিজেকে বিলীন করে দিয়েছিলেন। তিনি বলতেন:

“হে আল্লাহ! যদি আমি তোমার উপাসনা করি জান্নাত পাওয়ার আশায়, তবে আমাকে জান্নাত থেকে বঞ্চিত করো। আর যদি আমি তোমার ভয়ে জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য ইবাদত করি, তবে আমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করো। কিন্তু যদি আমি শুধুমাত্র তোমার প্রেমে পড়ে তোমার ইবাদত করি, তবে আমাকে আমার প্রভুর সাক্ষাৎ থেকে বঞ্চিত করো না।”

এই উক্তি আজও সুফি সাধকদের মুখে মুখে ফেরে।


👩‍❤️‍👨 বৈবাহিক জীবন:

রাবেয়া বসরী সারাজীবন অবিবাহিত ছিলেন। অনেক নামকরা আউলিয়া ও তৎকালীন আলেমরা তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ, তিনি নিজেকে কেবল আল্লাহর ভালোবাসায় সমর্পিত রেখেছিলেন।


📚 শিক্ষা ও প্রভাব:

রাবেয়া বসরী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মাদরাসায় পড়াশোনা করেননি, কিন্তু তাঁর আত্মজ্ঞান, আল্লাহভীতি, ঈমান ও হৃদয়জগতের গভীরতা ছিল অপূর্ব। তিনি অনেক বিখ্যাত সুফির অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিলেন। পরবর্তীকালে হাসান বসরী (রহঃ) ও অন্যান্য সুফি সাধকদের জীবনেও তাঁর প্রভাব পড়ে।


💫 মৃত্যুবরণ:

রাবেয়া বসরী (রহঃ) আনুমানিক ১৮৫ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। তিনি বসরা শহরেই ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।


🔚 উপসংহার:

হযরত রাবেয়া বসরী (রহঃ) ছিলেন এক অনন্য সাধ্বী, যিনি আল্লাহর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ও আত্মসমর্পণের প্রতীক। নারী হয়েও যেভাবে তিনি তাসাউফ চর্চা ও আধ্যাত্মিকতায় অবদান রেখেছেন, তা সত্যিই যুগান্তকারী। তাঁর জীবনচরিত মুসলিম নারীদের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0