নুহ (আ.) এর জীবনী

Jun 16, 2025 - 20:41
 0  0
নুহ (আ.) এর জীবনী

আপনি নুহ (আ.) এর জীবনী সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। নুহ (আ.) ছিলেন ইসলামের একজন গুরুত্বপূর্ণ পয়গম্বর, যাঁর নাম কোরআন ও বাইবেলে বিশেষভাবে উল্লেখিত হয়েছে।


নুহ (আ.) এর জীবনী (বিস্তারিত ব্যাখ্যা সহ)

নুহ (আ.) (আরবি: نوح, হিব্রু: נֹחַ) ছিলেন আল্লাহ তায়া’লার প্রেরিত একজন নবী ও রাসূল। পবিত্র কোরআনে ২৫টি সূরায় ৪৩ বার তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, এবং তাঁর নামে একটি সম্পূর্ণ সূরা (সূরা নূহ) রয়েছে। ইসলামে তাঁকে "উলুল আযম" বা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলদের অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়, যাঁদেরকে বিশেষভাবে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

১. নুহ (আ.) এর পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

নুহ (আ.) এর বংশ পরিচয় সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে, তবে অধিকাংশ ইসলামী পণ্ডিতের মতে, তিনি ছিলেন আদম (আ.) এর দশম পুরুষ বা তার কাছাকাছি। নুহ (আ.) এমন এক সময়ে প্রেরিত হয়েছিলেন যখন মানবজাতি শিরক (আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন) এবং মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়েছিল। তাঁর কওম (জাতি) মূর্তিপূজা, অহংকার এবং অন্যায়ে নিমজ্জিত ছিল। কোরআনে তাদের মূর্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন: ওয়াদ্দ, সুওয়া', ইয়াগূস, ইয়া'ঊক ও নসর। এই মূর্তিগুলো মূলত নেককার ব্যক্তিদের মূর্তি ছিল, যা পরবর্তীতে উপাস্যে পরিণত হয়।

২. নবুয়ত ও দাওয়াত:

আল্লাহ তায়া’লা নুহ (আ.)-কে তাঁর কওমের কাছে এক আল্লাহর ইবাদত করার এবং মূর্তি পূজা ত্যাগ করার দাওয়াত দিতে প্রেরণ করেন। নুহ (আ.) প্রায় ৯৫০ বছর ধরে তাঁর জাতিকে দাওয়াত দিয়েছিলেন বলে কোরআনে উল্লেখ আছে (সূরা আনকাবুত ২৯:১৪)। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি বিরামহীনভাবে তাঁর কওমকে একত্ববাদের দিকে আহ্বান জানান। তিনি বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন:

  • প্রকাশ্যে দাওয়াত: তিনি দিনের বেলায় প্রকাশ্যে দাওয়াত দিতেন, তাদের মজলিসে গিয়ে আল্লাহর বাণী শোনাতেন।
  • গোপনে দাওয়াত: তিনি গোপনেও ব্যক্তি পর্যায়ে মানুষের কাছে যেতেন এবং তাদেরকে আল্লাহর পথে আহ্বান করতেন।
  • ভয় প্রদর্শন ও সুসংবাদ: তিনি আল্লাহর শাস্তির ভয় দেখাতেন এবং ঈমান আনলে পুরস্কারের সুসংবাদ দিতেন। তিনি বলতেন, "তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের সম্পদ ও সন্তানসন্ততি বাড়িয়ে দেবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নদ-নদী সৃষ্টি করবেন।" (সূরা নূহ ৭১:১০-১২)

৩. কওমের প্রতিক্রিয়া:

নুহ (আ.) এর কওম তাঁর দাওয়াতকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে। তারা তাঁকে পাগল, মিথ্যাবাদী এবং পথভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করে। কোরআনে তাদের প্রতিক্রিয়া এভাবে বর্ণিত হয়েছে:

  • অহংকার ও বিরোধিতা: তারা তাদের কানে আঙ্গুল দিত, কাপড় দিয়ে নিজেদের মাথা ঢেকে নিত যেন তাঁর কথা শুনতে না হয়। তারা বলত, "তুমি তো একজন মানুষ ছাড়া আর কিছু নও, আর তোমার অনুসারীরা তো সমাজের নিম্নশ্রেণীর লোক।"
  • চ্যালেঞ্জ: তারা নুহ (আ.)-কে চ্যালেঞ্জ করে বলত, "যদি তুমি সত্যবাদী হও, তবে আমাদের উপর সেই আযাব নিয়ে এসো যার ভয় তুমি দেখাচ্ছ!" (সূরা হূদ ১১:৩২)।
  • বিরক্তি: দীর্ঘ দাওয়াতের পরও তারা বিরক্ত হয়ে বলত, "তুমি আমাদের সাথে ঝগড়া করেছ এবং বেশি করে ঝগড়া করেছ। সুতরাং তুমি যদি সত্যবাদী হও, তবে সেই আযাব নিয়ে এসো যার ভয় তুমি দেখাচ্ছ।" (সূরা হূদ ১১:৩২)

তাদের প্রত্যাখ্যান এত গভীর ছিল যে, দীর্ঘ ৯৫০ বছরেও অল্প সংখ্যক মানুষ ছাড়া আর কেউ ঈমান আনেনি। এই অল্প সংখ্যক লোকের মধ্যে তাঁর স্ত্রী ও এক সন্তান ছিল না, যারা ঈমান আনতে অস্বীকার করেছিল।

৪. মহাপ্রলয় (তুফান) এর আগমন:

দীর্ঘ দাওয়াত ও চরম প্রত্যাখ্যানের পর নুহ (আ.) আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করেন। তিনি তাঁর কওমের সংশোধনের আর কোনো আশা দেখতে পাচ্ছিলেন না। আল্লাহ তায়া’লা নুহ (আ.)-কে একটি বিশাল নৌকা বা জাহাজ (কিশতী/আর্ক) নির্মাণের নির্দেশ দেন।

  • নৌকা নির্মাণ: নুহ (আ.) আল্লাহর নির্দেশে মরুভূমির মাঝে নৌকা নির্মাণ শুরু করেন। কওমের লোকেরা তাঁকে বিদ্রূপ করত এবং হাসাহাসি করত, বলত, "তুমি কি এখন কাঠমিস্ত্রি হয়ে গেছ? এখানে সমুদ্র কোথায় যে তুমি নৌকা বানাচ্ছ?" নুহ (আ.) তাদের উপহাসের জবাব দিতেন না, কারণ তিনি জানতেন আল্লাহর নির্দেশ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
  • আরোহণের নির্দেশ: নৌকা নির্মাণ শেষ হলে আল্লাহ নুহ (আ.)-কে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন প্রতিটি প্রজাতির একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী প্রাণী এবং তাঁর পরিবারের যারা ঈমান এনেছে তাদের নিয়ে নৌকায় আরোহণ করেন। নুহ (আ.) এর অবাধ্য সন্তান এবং স্ত্রী ঈমান আনেনি বলে তারা আরোহণ করতে পারেনি।
  • তুফান: এরপর আল্লাহর নির্দেশে আকাশ থেকে প্রবল ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হয় এবং পৃথিবী থেকে ঝর্ণা ফেটে পানি বের হতে থাকে। বৃষ্টি ও মাটির নিচে থেকে ওঠা পানি একাকার হয়ে যায় এবং এক ভয়াবহ মহাপ্রলয় (তুফান) শুরু হয়। সূরা কামারে বলা হয়েছে, "আমরা আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করলাম এবং ভূমি থেকে ঝর্ণা প্রবাহিত করলাম, যাতে পানি এক নির্দিষ্ট ফয়সালায় একত্রিত হয়।" (সূরা কামার ৫৪:১১-১২)।
  • নিমজ্জিত কওম: নুহ (আ.) এর অবাধ্য কওম, যারা তাঁকে মিথ্যা বলেছিল, তারা সবাই এই মহাপ্লাবনে ডুবে মারা যায়। এমনকি নুহ (আ.) এর এক সন্তান, যে নৌকায় উঠতে অস্বীকার করেছিল, সেও ডুবে মারা যায়। নুহ (আ.) তার সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, কিন্তু আল্লাহ তাকে বলেছিলেন যে, সে তাঁর পরিবারভুক্ত নয় কারণ সে ছিল অবাধ্য।

৫. তুফানের পর:

পানি কমে যাওয়ার পর নৌকা জুদি পাহাড়ের উপর থামে (বর্তমানে ইরাক ও তুরস্কের সীমান্তে অবস্থিত বলে মনে করা হয়)। নুহ (আ.) এবং তাঁর সাথে যারা নৌকায় ছিলেন, তারা পৃথিবীতে নতুন জীবন শুরু করেন। কোরআন ও বাইবেল উভয়ই একমত যে, নুহ (আ.) এর এই ঘটনা মানবজাতির নতুন সূচনার প্রতীক। নুহ (আ.) এর তিন পুত্র – সাম, হাম এবং ইয়াফেস – এর মাধ্যমে মানবজাতি পুনরায় বিস্তার লাভ করে। ধারণা করা হয়, বর্তমান বিশ্বের সকল মানবজাতি এই তিন পুত্রের বংশধর।

৬. নুহ (আ.) এর শিক্ষা ও গুরুত্ব:

নুহ (আ.) এর কাহিনী মানবজাতির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে:

  • একত্ববাদ ও শিরকের বর্জন: নুহ (আ.) এর দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল আল্লাহর একত্ববাদ এবং মূর্তিপূজা বা শিরকের বর্জন।
  • ধৈর্য ও দৃঢ়তা: ৯৫০ বছর ধরে অবিরাম দাওয়াত দেওয়া তাঁর ধৈর্য ও দৃঢ়তার প্রমাণ।
  • আল্লাহর প্রতি আস্থা: চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও নুহ (আ.) আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন।
  • আযাবের সতর্কতা: যারা আল্লাহর রাসূলদের প্রত্যাখ্যান করে এবং পাপাচারে লিপ্ত থাকে, তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব আসার কঠোর সতর্কবাণী।
  • কিয়ামত ও আখিরাত: নুহ (আ.) এর ঘটনা কিয়ামতের দিন এবং আখিরাতের শাস্তির একটি প্রতীকী রূপ হিসেবেও বিবেচিত হয়।

নুহ (আ.) এর জীবন কাহিনী, তাঁর অবিচল ধৈর্য, এবং আল্লাহর প্রতি তাঁর অগাধ বিশ্বাস মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0