হযরত ইবরাহীম (আ:) এর জীবনী

Jun 16, 2025 - 20:34
 0  0
হযরত ইবরাহীম (আ:) এর জীবনী

ইবরাহিম (আ.) এর জীবনী বিস্তারিত ব্যাখ্যা সহ

হযরত ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) ছিলেন ইসলামের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল। তাঁকে "আবুল আম্বিয়া" বা নবীদের পিতা বলা হয়, কারণ তাঁর বংশ থেকেই শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) সহ অসংখ্য নবীর আগমন ঘটেছে। তিনি কেবল মুসলিমদের কাছেই নন, ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছেও অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ছিল পরীক্ষা, ত্যাগ, ধৈর্য এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন:

ইবরাহিম (আ.) পশ্চিম ইরাকের বসরা নিকটবর্তী 'বাবেল' শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন আযর (কুরআনে বর্ণিত) বা তারাহ (বাইবেলে বর্ণিত), যিনি ছিলেন মূর্তিপূজারী এবং সম্ভবত নমরুদের একজন মন্ত্রী বা পুরোহিত। ইবরাহিম (আ.) এমন এক সমাজে বেড়ে ওঠেন যেখানে মূর্তি পূজা, তারকা পূজা এবং বহু-ঈশ্বরবাদ প্রচলিত ছিল। তৎকালীন সম্রাট নমরুদ নিজেকেই উপাস্য দাবি করতেন এবং তাঁর রাজ্যে শিরকের ব্যাপক প্রচলন ছিল। শৈশব থেকেই ইবরাহিম (আ.) এই অন্যায় ও শিরকপূর্ণ পরিবেশ থেকে নিজেকে মুক্ত রেখেছিলেন এবং আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি তাঁর গভীর বিশ্বাস জন্মেছিল।

নবুয়ত লাভ ও দাওয়াত:

সাধারণত অনুমান করা হয়, ইবরাহিম (আ.) ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন। নবুয়ত লাভের পর তিনি তাঁর জাতি, বিশেষ করে তাঁর পিতাকে একত্ববাদের দিকে আহ্বান জানানো শুরু করেন। তিনি মূর্তিপূজার অসারতা যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, এই মূর্তিগুলো তো মানুষের হাতে তৈরি, তাদের কোনো ক্ষমতা নেই যে, তারা কারো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে। তিনি আকাশে চাঁদ, সূর্য ও তারকারাজি উদয়-অস্ত হতে দেখে যুক্তি দেখান যে, এগুলো কখনো খোদা হতে পারে না, কারণ এগুলো পরিবর্তনশীল ও ক্ষণস্থায়ী। চিরন্তন সত্তা কেবল আল্লাহই হতে পারেন, যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং নিয়ন্ত্রণ করেন।

তাঁর পিতা ও সম্প্রদায় তাঁর দাওয়াতে কর্ণপাত করেনি, বরং উপহাস করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। সূরা মারইয়ামে বর্ণিত হয়েছে, তাঁর পিতা তাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যার হুমকি দেন এবং তার থেকে দূরে চলে যেতে বলেন। কিন্তু ইবরাহিম (আ.) বিনয় ও ভালোবাসার সাথে তাঁর পিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহর কাছে হেদায়েত কামনা করেন।

মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও অগ্নিপরীক্ষা:

ইবরাহিম (আ.) যখন দেখলেন তাঁর জাতির মানুষ তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করছে না, তখন তিনি এক সাহসী পদক্ষেপ নেন। উৎসবের দিন যখন সবাই মেলায় গিয়েছিল, তখন তিনি মন্দিরের সব মূর্তি ভেঙে ফেলেন, শুধু বড় মূর্তিটি অক্ষত রাখেন। যখন লোকেরা ফিরে আসে এবং তাদের মূর্তিগুলো ভাঙা দেখে, তখন তারা বুঝতে পারে যে এটি ইবরাহিম (আ.)-এর কাজ।

তারা ইবরাহিম (আ.)-কে ধরে নিয়ে আসে এবং জিজ্ঞেস করে, "তুমি কি আমাদের দেব-দেবীকে এমন করেছ?" ইবরাহিম (আ.) উত্তরে বলেন, "বরং এই বড় মূর্তিটিই করেছে, একেই জিজ্ঞেস করো যদি এরা কথা বলতে পারে।" তাঁর এই বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ উত্তর শুনে লোকেরা হতবাক হয়ে যায় এবং নিজেদের ভুল বুঝতে পারে। কিন্তু তাদের অহংকার তাদেরকে সত্য গ্রহণে বাধা দেয়। তারা ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত নেয়।

নমরুদের নির্দেশে বিশাল এক অগ্নিকুণ্ড তৈরি করা হয়। ইবরাহিম (আ.)-কে রশি দিয়ে বেঁধে সেই অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু আল্লাহর কুদরতে আগুন ইবরাহিম (আ.)-এর জন্য 'ঠান্ডা ও শান্তিদায়ক' হয়ে যায়। তিনি অক্ষত অবস্থায় আগুন থেকে বেরিয়ে আসেন। এই ঘটনা ছিল তাঁর নবুয়তের এক স্পষ্ট নিদর্শন এবং আল্লাহর প্রতি তাঁর অবিচল বিশ্বাসের প্রতিফলন।

হিজরত ও পরিবার:

অগ্নিপরীক্ষার পর ইবরাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী সারাহ (আ.) এবং ভাতিজা লুত (আ.)-কে নিয়ে জন্মভূমি বাবেল থেকে হিজরত করেন। প্রথমে তিনি উর শহরে যান, এরপর হারানে। সেখান থেকে তিনি ফিলিস্তিনের কান'আন অঞ্চলে যান এবং পরবর্তীতে মিশরে কিছুকাল অবস্থান করেন।

ইবরাহিম (আ.)-এর প্রথম স্ত্রী সারাহ (আ.)-এর অনেক বয়স হয়ে গেলেও তাঁদের কোনো সন্তান হচ্ছিল না। তখন সারাহ (আ.) তাঁর স্বামী ইবরাহিম (আ.)-কে তাঁর দাসী হাজেরা (আ.)-কে বিবাহ করার পরামর্শ দেন। হাজেরা (আ.)-এর গর্ভে ইবরাহিম (আ.)-এর প্রথম পুত্র ইসমাইল (আ.) জন্মগ্রহণ করেন।

ইসমাইল (আ.) ও হাজেরা (আ.)-কে মক্কায় রেখে আসা:

আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহিম (আ.) তাঁর শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.) এবং স্ত্রী হাজেরা (আ.)-কে তৎকালীন জনমানবহীন ও পানিবিহীন মক্কা উপত্যকায় রেখে আসেন। এটি ছিল ইবরাহিম (আ.)-এর জন্য এক কঠিন পরীক্ষা, কারণ তিনি তাঁর কলিজার টুকরা সন্তান ও স্ত্রীকে এমন এক নির্জন স্থানে রেখে যাচ্ছিলেন। হাজেরা (আ.) যখন জানতে পারলেন যে এটি আল্লাহর নির্দেশ, তখন তিনি আল্লাহর উপর ভরসা করে ধৈর্য ধারণ করেন।

খাবার ও পানি ফুরিয়ে গেলে শিশু ইসমাইল (আ.) পানির অভাবে ছটফট করতে থাকেন। হাজেরা (আ.) পানির সন্ধানে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে বারবার ছুটাছুটি করেন। সাতবার ছুটাছুটির পর আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে জমজম কূপের সৃষ্টি করেন। এই ঘটনা হজ্বের 'সাঈ' নামক ইবাদতের ভিত্তি স্থাপন করে। পরবর্তীতে এই স্থানেই জুরহুম গোত্রের লোকেরা এসে বসতি স্থাপন করে এবং মক্কা জনবসতিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কাবা শরীফ নির্মাণ:

পরবর্তীকালে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে ইবরাহিম (আ.) তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে সঙ্গে নিয়ে কাবা ঘর পুনর্নির্মাণ করেন। কাবা ছিল মানবজাতির জন্য আল্লাহর ইবাদতের প্রথম ঘর, যা হযরত আদম (আ.) নির্মাণ করেছিলেন এবং নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) দু'জনে মিলে কাবার ভিত্তি স্থাপন করেন এবং তা পুনর্গঠন করেন। কাবা নির্মাণের সময় ইবরাহিম (আ.) দোয়া করেছিলেন, "হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের থেকে কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" (সূরা বাকারা: ১২৭)। তাঁদের এই কাজ মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অবিস্মরণীয় কীর্তি।

ইসহাক (আ.)-এর জন্ম ও কঠিন পরীক্ষা:

ইবরাহিম (আ.)-এর বৃদ্ধ বয়সে তাঁর প্রথম স্ত্রী সারাহ (আ.)-এর গর্ভে ইসহাক (আ.)-এর জন্ম হয়। ফেরেশতাদের মাধ্যমে আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে এই সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, যা ছিল তাঁর ও সারাহ (আ.)-এর জন্য এক অলৌকিক ঘটনা।

জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা ছিল আল্লাহর নির্দেশে নিজের প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করা। ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নে দেখেন যে তিনি তাঁর পুত্রকে কোরবানি করছেন। তিনি বুঝতে পারেন যে এটি আল্লাহর নির্দেশ। তিনি তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে এই স্বপ্নের কথা বলেন এবং ইসমাইল (আ.) তৎক্ষণাৎ আল্লাহর নির্দেশ পালনে সম্মত হন। যখন ইবরাহিম (আ.) তাঁর পুত্রকে কোরবানি করতে উদ্যত হন, তখন আল্লাহ তায়ালা এর পরিবর্তে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দেন। এই ঘটনা ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এবং মুসলিম বিশ্বে ঈদুল আযহা পালনের মূল ভিত্তি।

উপাধি ও গুরুত্ব:

ইবরাহিম (আ.)-কে "খলিলুল্লাহ" বা আল্লাহর বন্ধু উপাধি দেওয়া হয়েছে, যা আল্লাহর প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আনুগত্যের প্রতীক। তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রত্যয়ী নবীগণের একজন। ইসলাম, ইহুদি ও খ্রিস্টান – এই তিনটি প্রধান একেশ্বরবাদী ধর্মের অনুসারীরা তাঁকে নিজেদের আদি পিতা ও অন্যতম প্রধান নবী হিসেবে শ্রদ্ধা করেন। কুরআনে তাঁর নামে একটি সুরা রয়েছে (সূরা ইবরাহিম) এবং অসংখ্য আয়াতে তাঁর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে।

মৃত্যু:

ইবরাহিম (আ.) দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন বলে ধারণা করা হয় (প্রায় ২০০ বছর)। তিনি ফিলিস্তিনের হেবরনে ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।

ইবরাহিম (আ.)-এর জীবন এক মহান ত্যাগের, অবিচল বিশ্বাসের, এবং আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের এক অসাধারণ উদাহরণ। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ মুসলিম উম্মাহর জন্য চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0