জীবনানন্দ দাশ: রূপসী বাংলার কবি এবং আধুনিকতার প্রবক্তা

শিক্ষা জীবন তিনি বরিশাল ব্রজমোহন স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ইংরেজি সাহিত্য তাঁর চিন্তা ও কাব্যরীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

Feb 7, 2026 - 21:03
Feb 8, 2026 - 13:49
 0  1
জীবনানন্দ দাশ: রূপসী বাংলার কবি এবং আধুনিকতার প্রবক্তা
জীবনানন্দ-দাশ-রূপসী-বাংলার-কবি-এবং-আধুনিকতার-প্রবক্তা

জীবনানন্দ দাশ বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য নাম, যিনি নিভৃতচারি স্বভাব, গভীর অনুভব, এবং স্বতন্ত্র কাব্যভাষার মাধ্যমে আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন দিগন্তে নিয়ে গেছেন। তাঁকে বলা হয় “রূপসী বাংলার কবি”, কারণ তাঁর কবিতায় বাংলার প্রকৃতি, গ্রাম, নদী, মাঠ, পাখি এবং আলোছায়ার এক অপূর্ব জগৎ জীবন্ত হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে তিনি আধুনিকতার প্রবক্তা, কারণ তাঁর কাব্যে একাকীত্ব, সময়বোধ, নগরচেতনা এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন নতুনভাবে প্রকাশ পেয়েছে।


জন্ম ও শৈশব

জীবনানন্দ দাশ জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, বরিশালে। তাঁর পরিবার ছিল শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা।

  • বাবা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন শিক্ষক ও সমাজসেবক

  • মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি

শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিবেশে বড় হওয়ায় তাঁর মধ্যে কাব্যচেতনার বীজ গড়ে ওঠে।


শিক্ষা জীবন

তিনি বরিশাল ব্রজমোহন স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ইংরেজি সাহিত্য তাঁর চিন্তা ও কাব্যরীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।


কর্মজীবন

জীবনানন্দ দাশ পেশায় ছিলেন শিক্ষক। তিনি বিভিন্ন কলেজে ইংরেজি সাহিত্য পড়িয়েছেন, যেমন:

  • সিটি কলেজ, কলকাতা

  • ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল

  • অন্যান্য স্বল্পমেয়াদি শিক্ষকতার পদ

তাঁর কর্মজীবন খুব স্থিতিশীল ছিল না। চাকরি পরিবর্তন, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা তাঁর জীবনের অংশ ছিল, যা তাঁর কবিতায়ও প্রতিফলিত হয়েছে।


সাহিত্যজীবন ও কাব্যধারা

প্রথম জীবনে তাঁর কবিতা তেমন সমাদৃত হয়নি। রবীন্দ্রপ্রভাবিত কাব্যধারার বাইরে তাঁর ভাষা ও চিত্রকল্প অনেকের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর স্বাতন্ত্র্য স্বীকৃতি পায়।

তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য:

  • প্রকৃতির নতুন ও চিত্রময় উপস্থাপন

  • গভীর একাকীত্ব ও নৈঃসঙ্গ্যের অনুভব

  • সময় ও স্মৃতির মিশ্রণ

  • নগরজীবনের ক্লান্তি

  • আধুনিক প্রতীক ও ইমেজ


উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ

জীবনানন্দ দাশের গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থগুলো হল:

  • ঝরা পালক

  • ধূসর পাণ্ডুলিপি

  • বনলতা সেন

  • মহাপৃথিবী

  • সাতটি তারার তিমির

  • রূপসী বাংলা

রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থটি তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয় এবং বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এখানে বাংলার প্রকৃতিকে তিনি স্বপ্ন, স্মৃতি এবং সৌন্দর্যের মিশেলে এক অনন্য রূপ দিয়েছেন।


বনলতা সেন এবং জনপ্রিয়তা

“বনলতা সেন” কবিতাটি তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি দেয়। এই কবিতায় ক্লান্ত পথিকের আশ্রয় হিসেবে বনলতা সেন এক প্রতীকী চরিত্র। কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা হিসেবে বিবেচিত।


গদ্য ও অন্যান্য রচনা

শুধু কবিতা নয়, তিনি গল্প ও উপন্যাসও লিখেছেন। তাঁর গদ্যে আধুনিক মনস্তত্ত্ব, সম্পর্কের জটিলতা এবং সামাজিক বাস্তবতা উঠে এসেছে। মৃত্যুর পর তাঁর অনেক উপন্যাস ও গল্প প্রকাশিত হয়।


মৃত্যু

১৯৫৪ সালের অক্টোবরে কলকাতায় ট্রামের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন জীবনানন্দ দাশ। কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু ছিল আকস্মিক এবং বেদনাদায়ক।


সাহিত্যিক গুরুত্ব ও উত্তরাধিকার

আজ জীবনানন্দ দাশ বাংলা আধুনিক কবিতার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর কবিতা নতুন প্রজন্মের কবিদের প্রভাবিত করেছে। তিনি দেখিয়েছেন, কবিতা শুধু আবেগ নয়, চিন্তা, চিত্রকল্প এবং ভাষার গভীর নির্মাণও।

তাঁর অবদান সংক্ষেপে:

  • বাংলা আধুনিক কবিতার নতুন ভাষা নির্মাণ

  • প্রকৃতিচেতনার অভিনব রূপ

  • অস্তিত্ববাদী অনুভবের প্রকাশ

  • প্রতীকী ও ইমেজ নির্ভর কাব্যরীতি

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0