জসীমউদ্দীন: পল্লীকবি হিসেবে খ্যাত এবং “নকশী কাঁথার মাঠ”-এর অমর স্রষ্টা

Feb 8, 2026 - 13:49
 0  0
জসীমউদ্দীন: পল্লীকবি হিসেবে খ্যাত এবং “নকশী কাঁথার মাঠ”-এর অমর স্রষ্টা

জসীমউদ্দীন: পল্লীকবি হিসেবে খ্যাত এবং “নকশী কাঁথার মাঠ”-এর অমর স্রষ্টা

বাংলা সাহিত্যে গ্রামবাংলার মাটি, মানুষের জীবন, লোকসংস্কৃতি ও আবেগকে যিনি সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছেন, তিনি জসীমউদ্দীন। তাঁকে বলা হয় “পল্লীকবি”, কারণ তাঁর কবিতা ও কাব্যগাথায় গ্রামীণ জীবনের হাসি কান্না, প্রেম বিরহ, রীতি রেওয়াজ এবং লোকজ ঐতিহ্য জীবন্ত হয়ে উঠেছে। শহরমুখী সাহিত্যধারার বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি বাংলার পল্লীজীবনকে সাহিত্যের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।

তাঁর বিখ্যাত কাব্য “নকশী কাঁথার মাঠ” শুধু একটি প্রেমকাহিনি নয়, এটি গ্রামীণ বাঙালির অনুভূতি, স্মৃতি এবং শিল্পরুচির এক অনন্য দলিল। সহজ ভাষা, কথ্যরীতি এবং লোকগাথার ঢঙে লেখা তাঁর রচনা বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে আলাদা স্বর।


জন্ম ও শৈশব

জসীমউদ্দীন জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি, ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে।

  • পিতা: আনসার উদ্দীন মোল্লা, শিক্ষক

  • পরিবার ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত

শৈশব থেকেই তিনি গ্রামবাংলার গান, পালাগান, গল্প এবং লোককথার পরিবেশে বড় হন। এই অভিজ্ঞতাই পরে তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।


শিক্ষা জীবন

তিনি ফরিদপুর জেলা স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি লোকসাহিত্য সংগ্রহে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি বিখ্যাত শিক্ষাবিদ দীনেশচন্দ্র সেনের সংস্পর্শে আসেন। তাঁর উৎসাহে জসীমউদ্দীন গ্রামাঞ্চল থেকে লোকগান ও পালাগান সংগ্রহের কাজে যুক্ত হন।


সাহিত্যজীবনের বৈশিষ্ট্য

জসীমউদ্দীনের সাহিত্য মূলত পল্লীভিত্তিক। তিনি গ্রামবাংলার মানুষের ভাষা, উপভাষা এবং জীবনচিত্র সরাসরি ব্যবহার করেছেন।

তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য:

  • সহজ ও কথ্য ভাষা

  • লোকগাথার ঢঙ

  • গ্রামীণ প্রেম ও বিরহ

  • সামাজিক রীতি ও পারিবারিক সম্পর্ক

  • প্রকৃতি ও মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক

তিনি প্রমাণ করেন যে সাধারণ মানুষের জীবনও মহৎ সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে।


“নকশী কাঁথার মাঠ”

“নকশী কাঁথার মাঠ” তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্যগুলোর একটি এবং বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক রচনা। এটি একটি গ্রামীণ প্রেমকাহিনি, যেখানে রূপাই ও সাজুর জীবনের মাধ্যমে প্রেম, বিচ্ছেদ এবং স্মৃতির বেদনাকে তুলে ধরা হয়েছে।

এই কাব্যের বিশেষ দিক:

  • লোককাহিনির বর্ণনাশৈলী

  • আবেগঘন প্রেমের কাহিনি

  • নকশী কাঁথাকে স্মৃতি ও শিল্পের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার

  • গ্রামীণ নারীর মনের গভীর প্রকাশ

এই রচনা বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং নাটক ও মঞ্চে রূপ পেয়েছে।


অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনা

জসীমউদ্দীনের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলো হল:

  • সোজন বাদিয়ার ঘাট

  • রাখালী

  • বালুচর

  • ধানক্ষেত

  • হাসু

  • পদ্মাপার

এসব রচনায় গ্রামবাংলার জীবন, উৎসব, দুঃখ, ভালোবাসা এবং লোকবিশ্বাস ফুটে উঠেছে।


লোকসাহিত্য সংগ্রাহক হিসেবে ভূমিকা

তিনি শুধু কবি নন, একজন গুরুত্বপূর্ণ লোকসাহিত্য সংগ্রাহকও ছিলেন। তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে:

  • লোকগান সংগ্রহ করেছেন

  • পালাগান লিপিবদ্ধ করেছেন

  • গ্রামীণ কাহিনি সংরক্ষণ করেছেন

এই কাজ বাংলা লোকসংস্কৃতি গবেষণায় বড় অবদান রাখে।


কর্মজীবন

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। এছাড়া বেতার ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর কণ্ঠে লোকগান পাঠ ও আলোচনা একসময় খুব জনপ্রিয় ছিল।


মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

জসীমউদ্দীন ১৯৭৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর সাহিত্য আজও সমান জনপ্রিয়। বাংলা সাহিত্যে গ্রামীণ জীবনচিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি সর্বাগ্রে স্মরণীয়।

তাঁর অবদান সংক্ষেপে:

  • পল্লীজীবনকে সাহিত্যের মূলধারায় আনা

  • লোকভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা

  • লোকগাথাভিত্তিক কাব্যের বিকাশ

  • গ্রামীণ প্রেমকাহিনিকে বিশ্বমানে তুলে ধরা

What's Your Reaction?

Like Like 0
Dislike Dislike 0
Love Love 0
Funny Funny 0
Angry Angry 0
Sad Sad 0
Wow Wow 0