জওহরলাল নেহরু: আধুনিক ভারতের রূপকার
জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্ব, গণতান্ত্রিক দর্শন, অর্থনৈতিক নীতি ও আধুনিক ভারতের গঠনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা।
১৯৪৭ সালে যখন ভারত স্বাধীনতার দোরগোড়ায় দাঁড়ায়, তখন সামনে ছিল অগণিত চ্যালেঞ্জ। দেশভাগের বেদনায় বিধ্বস্ত এক নবজাত রাষ্ট্রকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাঠামোতে পুনর্গঠন করার দায়িত্ব এসে পড়ে Jawaharlal Nehru–এর কাঁধে। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু প্রশাসকই ছিলেন না, বরং ছিলেন এক দূরদর্শী রাষ্ট্রনির্মাতা।
আজকের দিনে যখন গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং বৈদেশিক নীতির প্রশ্ন নতুন করে আলোচিত হচ্ছে, তখন নেহেরুর ভূমিকা আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি কি নিছক এক আদর্শবাদী নেতা ছিলেন, নাকি বাস্তবতার নিরিখে ভবিষ্যৎ ভারতের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে তাঁর জীবন ও নীতি নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন।
আধুনিক ভারতের স্থপতি: নেহেরুর নেতৃত্বের বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ
নেহেরু ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা এবং মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। স্বাধীনতার পর তাঁর প্রথম ও প্রধান কাজ ছিল একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্বের অনেক নবস্বাধীন দেশ যেখানে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঝুঁকেছিল, সেখানে ভারত নিয়মিত নির্বাচন ও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, বহুধর্মীয় ও বহুভাষিক ভারতকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি মিশ্র অর্থনীতির মডেল গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন, পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প যেমন বাঁধ ও ইস্পাত কারখানা গড়ে তোলা তাঁর উন্নয়ন নীতির অংশ ছিল।
বিদেশনীতি ক্ষেত্রে তিনি নন অ্যালাইন্ড আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কোনো একপক্ষের সঙ্গে সরাসরি জোট না করে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার চেষ্টা করেন।
আরও পড়ুন:
এই নীতিগুলো আধুনিক ভারতের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিতর্ক, সমালোচনা ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ
নেহেরুর অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিল্পনীতি বেসরকারি খাতের বিকাশকে সীমিত করেছিল। আবার অন্যরা বলেন, উপনিবেশোত্তর অর্থনীতির বাস্তবতায় এই নীতি ছিল প্রয়োজনীয়।
১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সংঘর্ষে ভারতের সামরিক প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায় এবং তাঁর পররাষ্ট্রনীতির আদর্শবাদ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
রাজনৈতিকভাবে কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরীণ আধিপত্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কাঠামোতে প্রভাব ফেলেছিল। যদিও গণতন্ত্র টিকে ছিল, তবুও কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।
এই বিতর্কগুলো আজও অর্থনৈতিক সংস্কার, নিরাপত্তা নীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন নিয়ে আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।
বাস্তব প্রভাব ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা
নেহেরুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আজও ভারতের প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ভিত্তি। আইআইটি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্রগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদে শিল্প ও কৃষিক্ষেত্রে অবদান রেখেছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর তাঁর নেতৃত্বের বড় সাফল্য।
বিদেশনীতি ক্ষেত্রে আজও ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতার ধারণা তাঁর নীতির প্রতিফলন বহন করে।
উপসংহার
জওহরলাল নেহেরুর জীবন আধুনিক ভারতের নির্মাণকাহিনি। তিনি ছিলেন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, আদর্শবাদী চিন্তাবিদ এবং প্রতিষ্ঠান গড়ার কারিগর।
তাঁর নীতির মধ্যে যেমন অর্জন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিতর্ক। ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে দেখা যায় না। নেহেরুর উত্তরাধিকার আমাদের শেখায়, জাতি গঠনের পথ সবসময়ই জটিল এবং বহুস্তরবিশিষ্ট।
প্রশ্ন ও উত্তর: নেহেরুকে আরও গভীরভাবে জানা
১. কেন নেহেরুকে আধুনিক ভারতের স্থপতি বলা হয়?
কারণ তিনি স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বৈদেশিক নীতির ভিত্তি স্থাপন করেন।
রিসোর্স: https://www.britannica.com/biography/Jawaharlal-Nehru
২. তাঁর অর্থনৈতিক নীতি কী ছিল?
তিনি মিশ্র অর্থনীতি ও পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন।
৩. তাঁর নেতৃত্বের প্রধান সমালোচনা কী?
১৯৬২ সালের যুদ্ধ এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক মডেল নিয়ে বিতর্ক।
৪. তাঁর উত্তরাধিকার আজও কেন প্রাসঙ্গিক?
কারণ গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং কৌশলগত স্বাধীনতার ধারণা আজও নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে।
আরও পড়ুন: https://www.bbc.com/news/world-asia-india-19881877
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0