Writer · British Raj
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬–১৯৩৮) — দেবদাস, পরিণীতা, শ্রীকান্ত, গৃহদাহ ও পথের দাবীর লেখক; বাংলা ভাষার সবচেয়ে পঠিত ও সবচেয়ে বেশি চলচ্চিত্রায়িত ঔপন্যাসিক, যাঁর প্রথম বই বেরিয়েছিল ছত্রিশ বছর বয়সে।
Wikimedia Commonsশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা ভাষার সবচেয়ে পঠিত ঔপন্যাসিকদের একজন — যাঁর দেবদাস নিয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে কুড়িটিরও বেশি চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিজ হয়েছে, আর যাঁর পরিণীতা, শ্রীকান্ত, চরিত্রহীন, গৃহদাহ একশো বছর পরেও ছাপা হয়ে চলেছে। বাংলা সাহিত্যে তিনি অপরাজেয় কথাশিল্পী। জীবনের গল্পটা তাঁর উপন্যাসের মতোই: দারিদ্র্য, ঘরছাড়া হওয়া, বার্মার কেরানির চাকরি — আর ছত্রিশ পেরিয়ে প্রথম বই।
Selected bibliography
| Year | Work | Form | Translated as |
|---|---|---|---|
| 1913 | বড়দিদি | উপন্যাস | Bardidi |
| 1914 | পরিণীতা | উপন্যাস | Parineeta |
| 1914 | বিরাজ বৌ | উপন্যাস | Biraj Bou |
| 1916 | চন্দ্রনাথ | উপন্যাস | Chandranath |
| 1916 | পল্লী-সমাজ | উপন্যাস | Pallisamaj |
| 1917 | চরিত্রহীন | উপন্যাস | Charitraheen |
| 1917 | দেবদাস | উপন্যাস | Devdas |
| 1917–1933 | শ্রীকান্ত | উপন্যাস | Srikanta (four parts) |
| 1918 | দত্তা | উপন্যাস | Datta |
| 1920 | গৃহদাহ | উপন্যাস | Grihadaha |
| 1920 | বিলাসী | ছোটগল্প | Bilasi |
| 1926 | পথের দাবী | উপন্যাস | Pather Dabi |
| 1935 | বিপ্রদাস | উপন্যাস | Bipradas |
| 1938 | শুভদা | উপন্যাস | Shubhada |
কর্মজীবনের সময়রেখা
- 1876
হুগলির দেবানন্দপুর গ্রামে জন্ম
- 1903
জানুয়ারিতে জীবিকার সন্ধানে বার্মায় যাত্রা
- 1906
এপ্রিলে রেঙ্গুনে পাবলিক ওয়ার্কস অ্যাকাউন্টস অফিসে কেরানির চাকরি — পরের দশ বছর এখানেই
- 1912
অক্টোবরে ছুটিতে দেশে এসে 'যমুনা' পত্রিকার সম্পাদক ফণীন্দ্রনাথ পালের অনুরোধ; রেঙ্গুন থেকে পাঠানো 'রামের সুমতি' ছাপা হয়
- 1913
'বড়দিদি' গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়
- 1916
ছুটি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মনোমালিন্যে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে তেরো বছর পর বার্মা থেকে বাংলায় ফেরেন
- 1921
হাওড়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি (১৯৩৬ পর্যন্ত)
- 1923
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক লাভ; হাওড়ার সামতাবেড়ে রূপনারায়ণের তীরে নিজের বাড়ি
- 1926
'পথের দাবী' প্রকাশিত
- 1927
৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ সরকার 'পথের দাবী' নিষিদ্ধ ঘোষণা করে
- 1936
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি-লিট প্রদান করে
- 1938
১৬ জানুয়ারি কলকাতায় মৃত্যু
জীবনী
দেবানন্দপুর, ভাগলপুর
জন্ম ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬ (৩১ ভাদ্র ১২৮৩), হুগলির দেবানন্দপুর গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে — মতিলাল চট্টোপাধ্যায় ও ভুবনমোহিনী দেবীর দ্বিতীয় সন্তান, ডাকনাম ন্যাঁড়া। অভাবের কারণে বাবা সপরিবারে থাকতেন ভাগলপুরে শ্বশুরবাড়িতে, তাই শৈশবের বেশিরভাগটা কেটেছে সেখানেই। পড়াশোনা বারবার থেমেছে ফি-র অভাবে: ১৮৯২-এ হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুল ছাড়তে হয়, ১৮৯৪-এ এনট্রান্স পাস করে ভাগলপুরের তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজে ভর্তি হলেও এফএ পরীক্ষার ফি জোগাড় না হওয়ায় পরীক্ষাতেই বসা হয়নি।
তবু এই ভাগলপুরের বছরগুলোতেই, পাড়ার এক সাহিত্যসভাকে ঘিরে, লেখা হয়ে যায় বড়দিদি, দেবদাস, চন্দ্রনাথ, শুভদা — যেগুলো বই হয়ে বেরোবে বহু বছর পর। মাঝখানে বাবার সঙ্গে অভিমানে সন্ন্যাসী সেজে ঘর ছাড়া, বাবার মৃত্যু, কলকাতায় মাসে তিরিশ টাকায় হিন্দি বই ইংরেজিতে তর্জমার কাজ। 'মন্দির' নামে একটা গল্প কুন্তলীন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পায় — প্রথম স্বীকৃতি।
রেঙ্গুনের তেরো বছর
১৯০৩-এর জানুয়ারিতে জীবিকার খোঁজে রেঙ্গুন। বার্মা রেলওয়ের অডিট অফিসে অস্থায়ী চাকরি, দু'বছর পর সেটা যায়; ১৯০৬-এর এপ্রিল থেকে পাবলিক ওয়ার্কস অ্যাকাউন্টস অফিসে কেরানি — পরের দশ বছর এই চাকরিই। থাকতেন রেঙ্গুনের উপকণ্ঠে কারখানার মিস্ত্রিদের পল্লিতে। সেখানেই নিচের তলার প্রতিবেশী শান্তি দেবীকে এক মাতালের সঙ্গে বিয়ে থেকে বাঁচাতে তিনি নিজে বিয়ে করেন তাঁকে; একটি ছেলে হয়, আর প্লেগে স্ত্রী-পুত্র দুজনকেই হারান। অনেক পরে রেঙ্গুনেই বিয়ে করেন চোদ্দো বছরের মোক্ষদাকে, যাঁর নাম রাখেন হিরণ্ময়ী দেবী; এই দম্পতি ছিলেন নিঃসন্তান।
লেখক-জীবন শুরু হয় প্রায় দৈবক্রমে। ১৯১২-র অক্টোবরে এক মাসের ছুটিতে দেশে এসে 'যমুনা' পত্রিকার সম্পাদক ফণীন্দ্রনাথ পালের অনুরোধ পান; রেঙ্গুনে ফিরে পাঠান 'রামের সুমতি'। তারপর 'ভারতবর্ষ' পত্রিকা, আর ১৯১৩-এ ফণীন্দ্রনাথের হাতেই বই হয়ে বেরোয় বড়দিদি — বছর কুড়ি আগে লেখা উপন্যাস, লেখকের বয়স তখন ছত্রিশ পেরিয়েছে। ১৯১৬-য় ছুটি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মনোমালিন্যে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে তিনি বাংলায় ফিরে আসেন — এবার পুরোপুরি লেখক হয়ে।
অপরাজেয় কথাশিল্পী
পরের দশকে একের পর এক: পরিণীতা (১৯১৪), চরিত্রহীন ও দেবদাস (১৯১৭), শ্রীকান্ত-এর প্রথম পর্ব (১৯১৭, শেষ পর্ব ১৯৩৩), দত্তা (১৯১৮), গৃহদাহ (১৯২০)। ১৯২৩-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী স্বর্ণপদক; ওই বছরই হাওড়ার সামতাবেড়ে রূপনারায়ণের তীরে নিজের মাটির বাড়ি, যেখানে তিনি থাকবেন এক দশকের বেশি।
রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন — ১৯২১ থেকে ১৯৩৬ পর্যন্ত হাওড়া জেলা কংগ্রেসের সভাপতি। ১৯২৬-এ প্রকাশিত পথের দাবী, সশস্ত্র বিপ্লবীদের নিয়ে লেখা উপন্যাস, ব্রিটিশ সরকার ৪ জানুয়ারি ১৯২৭ বাজেয়াপ্ত করে; নিষেধাজ্ঞা ওঠে ১৯৩৯-এ, তাঁর মৃত্যুর পরের বছর। ১৯৩৬-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি-লিট দেয় — যে মানুষটি এফএ পরীক্ষায় বসতে পারেননি।
শেষ
১৯৩৭ থেকে ঘন ঘন অসুস্থ; দেওঘরে কয়েক মাস কাটিয়ে ফিরে এলে ধরা পড়ে যকৃতের ক্যান্সার। কলকাতার পার্ক নার্সিং হোমে ১২ জানুয়ারি ১৯৩৮ অস্ত্রোপচার, আর চার দিন পর, ১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮ সকালে, মৃত্যু — একষট্টি বছর বয়সে। সামতাবেড়ের মাটির বাড়িটা ১৯৭৮-এর বন্যায় আশপাশের সব গ্রাম ভেসে গেলেও দাঁড়িয়ে থেকেছে; আজ সেটি সংরক্ষিত।
জানেন কি?
ফি জোগাড় করতে না পেরে শরৎচন্দ্র এফএ পরীক্ষাতেই বসতে পারেননি। বিয়াল্লিশ বছর পর, ১৯৩৬ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি-লিট দেয়।
সাধারণ প্রশ্ন
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে 'অপরাজেয় কথাশিল্পী' বলা হয় কেন?
বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর জনপ্রিয়তা আজও কেউ ছাড়াতে পারেনি বলে — তাঁর উপন্যাস একশো বছর ধরে ছাপা হচ্ছে, ভারতের প্রায় সব ভাষায় অনূদিত, আর দেবদাস নিয়েই কুড়িটির বেশি চলচ্চিত্র। 'অপরাজেয়' শব্দটা এই না-হারা জনপ্রিয়তারই স্বীকৃতি, যা তাঁর জীবদ্দশাতেই এসেছিল।
'দেবদাস' এত জনপ্রিয় হলো কেন?
গল্পটা সরল আর চেনা — শৈশবের ভালোবাসা পার্বতীকে হারিয়ে দেবদাসের ধীরে ধীরে নিজেকে শেষ করে দেওয়া। ভাগলপুরে তরুণ বয়সে লেখা উপন্যাসটি বই হয়ে বেরোয় ১৯১৭ সালে; ১৯৩৫-এ প্রমথেশ বড়ুয়ার চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে এর কুড়িটির বেশি চলচ্চিত্র-রূপ হয়েছে, আর 'দেবদাস' শব্দটাই বাংলায় ব্যর্থ প্রেমিকের প্রতিশব্দ হয়ে গেছে।
'পথের দাবী' নিষিদ্ধ হয়েছিল কেন?
১৯২৬ সালে প্রকাশিত উপন্যাসটির নায়ক সব্যসাচী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবী — বইটিতে ঔপনিবেশিক শাসনের সরাসরি বিরোধিতা ছিল। ব্রিটিশ ভারত সরকার ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি বইটি বাজেয়াপ্ত করে; নিষেধাজ্ঞা ওঠে ১৯৩৯ সালে, তাঁর মৃত্যুর এক বছর পর। শরৎচন্দ্র তখন হাওড়া জেলা কংগ্রেসের সভাপতি (১৯২১–৩৬)।
শরৎচন্দ্র বার্মায় গিয়েছিলেন কেন?
জীবিকার জন্য। কলেজ শেষ না করে, বাবার মৃত্যুর পর কলকাতায় সামান্য বেতনের কাজ করে ১৯০৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি রেঙ্গুনে যান, যেখানে এক আত্মীয় তাঁকে বার্মা রেলওয়ের অডিট অফিসে অস্থায়ী চাকরি জুটিয়ে দেন। পরে পাবলিক ওয়ার্কস অ্যাকাউন্টস অফিসে কেরানি হিসেবে দশ বছর — ১৯১৬ পর্যন্ত মোট তেরো বছর তিনি বার্মায় ছিলেন, আর লেখক হিসেবে পরিচিতি পান ওখানে বসেই।
তাঁর উপন্যাসে নারী চরিত্রগুলো এত কেন্দ্রীয় কেন?
কারণ তাঁর বেশিরভাগ উপন্যাসের কেন্দ্রেই একজন নারীর জীবন — বিরাজ বৌ, পরিণীতার ললিতা, চরিত্রহীনের সাবিত্রী, গৃহদাহের অচলা, শ্রীকান্তের রাজলক্ষ্মী। বিধবা, পরিত্যক্তা বা সমাজের নিয়মে আটকে পড়া মেয়েদের কথা তিনি লিখেছেন তাদের নিজের দিক থেকে, যা তখনকার বাংলা উপন্যাসে নতুন ছিল; নারীর অবস্থান নিয়ে তাঁর প্রবন্ধ 'নারীর মূল্য'-তেও একই প্রশ্ন।


