Writer · Bangladesh
হুমায়ূন আহমেদ
বাংলাদেশের সবচেয়ে পঠিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮–২০১২) — হিমু ও মিসির আলির স্রষ্টা, 'নন্দিত নরকে' থেকে 'ঘেটুপুত্র কমলা' পর্যন্ত যিনি বাংলা উপন্যাস, নাটক ও চলচ্চিত্র তিনটিই বদলে দিয়েছেন।
Wikimedia Commonsহুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যের সেই বিরল লেখক, যাঁর বই কিনতে বইমেলায় লাইন পড়ত আর যাঁর নাটক
প্রচারের সময় রাস্তা ফাঁকা হয়ে যেত। বাংলাদেশের পাঠকসংখ্যা তিনি এমনভাবে বাড়িয়েছিলেন, যা তাঁর
আগে বা পরে আর কেউ পারেননি।
নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি
| Year | Work | Form | Translated as |
|---|---|---|---|
| 1972 | নন্দিত নরকে | উপন্যাস | Nondito Noroke |
| 1973 | শঙ্খনীল কারাগার | উপন্যাস | Shonkhonil Karagar |
| 1984 | সৌরভ | উপন্যাস | Sourabh |
| 1985 | আমার আছে জল | উপন্যাস | Amar Ache Jol |
| 1985 | দেবী | উপন্যাস | Debi |
| 1985–2012 | মিসির আলি | উপন্যাস | Misir Ali (20 books) |
| 1986 | আগুনের পরশমণি | উপন্যাস | Aguner Poroshmoni |
| 1988 | প্রিয়তমেষু | উপন্যাস | Priyotomeshu |
| 1989 | হোটেল গ্রেভার ইন | আত্মজীবনী | Hotel Graver Inn |
| 1989 | বোতল ভূত | শিশুসাহিত্য | Botol Bhoot |
| 1990 | বহুব্রীহি | উপন্যাস | Bohubrihi |
| 1990 | ময়ূরাক্ষী | উপন্যাস | Mayurakkhi |
| 1990–2011 | হিমু | উপন্যাস | Himu (21 novels) |
| 1990 | এইসব দিনরাত্রি | নাটক | Eishob Dinratri |
| 1991 | দারুচিনি দ্বীপ | উপন্যাস | Daruchini Dip |
| 1991 | দুই দুয়ারী | উপন্যাস | Dui Duari |
| 1991–2010 | শুভ্র | উপন্যাস | Shuvro (6 novels) |
| 1991 | আমার ছেলেবেলা | আত্মজীবনী | Amar Chelebela |
| 1992 | অনিল বাগচীর একদিন | উপন্যাস | Anil Bagchir Ekdin |
| 1992 | কৃষ্ণপক্ষ | উপন্যাস | Krishnopokkho |
| 1992 | ফিহা সমীকরণ | সায়েন্স ফিকশন | Fiha Somikoron |
| 1993 | জল জোছনা | উপন্যাস | Jol Jochona |
| 1993 | এই আমি | আত্মজীবনী | Ei Ami |
| 1994 | যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ | উপন্যাস | Jokhon Giyeche Dube Ponchomir Chand |
| 1994 | শ্রাবণ মেঘের দিন | উপন্যাস | Srabon Megher Din |
| 1995 | গৌরীপুর জংশন | উপন্যাস | Gouripur Jongshon |
| 1996 | আমাদের শাদা বাড়ি | উপন্যাস | Amader Shada Bari |
| 1996 | কবি | উপন্যাস | Kobi |
| 1997 | অপেক্ষা | উপন্যাস | Opekkha |
| 1997 | মেঘ বলেছে যাব যাব | উপন্যাস | Megh Boleche Jabo Jabo |
| 2000 | বৃষ্টি বিলাস | উপন্যাস | Brishti Bilash |
| 2000 | ওমেগা পয়েন্ট | সায়েন্স ফিকশন | Omega Point |
| 2002 | দ্বিতীয় মানব | সায়েন্স ফিকশন | Dwitiyo Manob |
| 2003 | শ্যামল ছায়া | উপন্যাস | Shyamol Chhaya |
| 2004 | জোছনা ও জননীর গল্প | উপন্যাস | Jochona O Jononir Golpo |
| 2005 | লীলাবতী | উপন্যাস | Lilaboti |
| 2007 | মধ্যাহ্ন | উপন্যাস | Moddyanho |
| 2009 | বলপয়েন্ট | আত্মজীবনী | Ballpoint |
| 2010 | মাতাল হাওয়া | উপন্যাস | Matal Hawa |
| 2011 | বাদশাহ নামদার | উপন্যাস | Badshah Namdar |
| 2013 | দেয়াল | উপন্যাস | Deyal |
কর্মজীবনের সময়রেখা
- 1948
নেত্রকোনায় জন্ম
- 1971
মুক্তিযুদ্ধে পিতা ফয়জুর রহমান আহমেদ শহীদ হন
- 1972
প্রথম উপন্যাস 'নন্দিত নরকে' প্রকাশ
- 1994
পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র 'আগুনের পরশমণি' মুক্তি পায়
- 2011
অন্ত্রের ক্যানসার শনাক্ত, চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রা
- 2012
১৯ জুলাই নিউইয়র্কে মৃত্যু; নুহাশ পল্লীতে সমাধি
জীবনী
নেত্রকোনা থেকে ঢাকা
জন্ম ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮, নেত্রকোনা জেলায়। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা,
যিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন — পিরোজপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে। এই ক্ষত হুমায়ূনের
লেখায় বারবার ফিরে এসেছে, সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচনাগুলোয়।
পরিবারটি নিজেই এক সাহিত্যিক ঘরানা: ছোট ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল পদার্থবিজ্ঞানী ও শিশুসাহিত্যিক,
আরেক ভাই আহসান হাবীব কার্টুনিস্ট ও রম্যলেখক।
বিজ্ঞানী, যিনি লেখক হলেন
হুমায়ূন পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে, পরে যুক্তরাষ্ট্রে পলিমার কেমিস্ট্রিতে
পিএইচডি করেন। দেশে ফিরে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, অধ্যাপনা করেন দীর্ঘদিন।
কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় তৈরি হয়ে গিয়েছিল আরও আগে — ছাত্রাবস্থাতেই। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত
'নন্দিত নরকে' ছিল তাঁর প্রথম উপন্যাস, আর সেটিই প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যমহলের নজর কাড়ে। এরপর
'শঙ্খনীল কারাগার'। আশির দশকে এসে তিনি পুরোপুরি লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন, শেষ পর্যন্ত
অধ্যাপনা ছেড়ে দেন।
তাঁর গদ্যের বৈশিষ্ট্য ছিল সরলতা — ছোট বাক্য, দৈনন্দিন সংলাপ, আর মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের
চেনা দৃশ্য। সমালোচকেরা একে কখনো 'হালকা' বলেছেন, কিন্তু এই সরলতাই লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রথমবারের
মতো বাংলা উপন্যাস পড়তে বসিয়েছিল।
হিমু ও মিসির আলি
দুটি চরিত্র তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়, এবং দুটি পরস্পরের বিপরীত।
হিমু — হলুদ পাঞ্জাবি পরা, খালি পায়ে হাঁটা, চাকরিবিহীন এক যুবক, যে যুক্তির বদলে চলে
স্বজ্ঞায় আর সমাজের নিয়ম নিয়ে খেলা করে। মিসির আলি — মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক, যিনি অতিপ্রাকৃত
বলে দাবি করা প্রতিটি ঘটনাকে যুক্তি দিয়ে ভাঙেন।
একজন যুক্তি অস্বীকার করেন, আরেকজন যুক্তিই তাঁর একমাত্র অস্ত্র। এই দুই বিপরীত চরিত্রকে একই কলমে
সমান বিশ্বাসযোগ্যভাবে তৈরি করাই হুমায়ূনের কারিগরি দক্ষতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
টেলিভিশন এবং 'বাকের ভাই'
আশি ও নব্বইয়ের দশকে হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের টেলিভিশনকে কার্যত নতুন করে গড়েন।
'এইসব দিনরাত্রি', 'বহুব্রীহি', 'অয়োময়' — এই ধারাবাহিকগুলো প্রচারের সময় দর্শক
টিভির সামনে বসে থাকত।
কিন্তু সবচেয়ে অসাধারণ ঘটনাটি ঘটে 'কোথাও কেউ নেই' নাটক নিয়ে। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র
বাকের ভাই-এর ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে ঢাকার রাস্তায় সত্যিকারের মিছিল বের হয় — একটি
কাল্পনিক চরিত্রকে বাঁচানোর দাবিতে। বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসে এমন ঘটনা আর ঘটেনি, আর এটিই
প্রমাণ করে তাঁর চরিত্ররা দর্শকের কাছে কতটা জীবন্ত ছিল।
চলচ্চিত্র
পরিচালক হিসেবেও তিনি সফল। 'আগুনের পরশমণি' (১৯৯৪) — মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এই ছবিটি
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে একাধিক শাখায় সম্মানিত হয়। এরপর 'শ্রাবণ মেঘের দিন',
'দুই দুয়ারী', 'শ্যামল ছায়া'। তাঁর শেষ ছবি 'ঘেটুপুত্র কমলা' (২০১২), যা মৃত্যুর
কাছাকাছি সময়ে নির্মিত।
নুহাশ পল্লী ও ব্যক্তিগত জীবন
গাজীপুরে তিনি গড়ে তোলেন নুহাশ পল্লী — ব্যক্তিগত বাগানবাড়ি, যা তাঁর লেখার জায়গা ও
শুটিং স্পট দুই-ই ছিল। জ্যেষ্ঠ পুত্রের নামে এর নামকরণ।
প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন খান; তাঁদের সন্তানদের মধ্যে আছেন লেখক নোভা, শীলা ও বিপাশা এবং পুত্র
নুহাশ। পরবর্তীতে তিনি বিয়ে করেন অভিনেত্রী ও নির্মাতা মেহের আফরোজ শাওন-কে। এই দ্বিতীয়
বিবাহ সে সময় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
শেষ বছর
২০১১ সালে তাঁর অন্ত্রের ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসার জন্য তিনি যান যুক্তরাষ্ট্রে, নিউইয়র্কে।
অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি লেখা চালিয়ে যান। ১৯ জুলাই ২০১২ নিউইয়র্কে তাঁর মৃত্যু হয়।
তাঁকে সমাহিত করা হয় নুহাশ পল্লীতেই — যে জায়গাটি তিনি নিজে হাতে গড়েছিলেন।
স্বীকৃতি ও উত্তরাধিকার
হুমায়ূন আহমেদ পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও একুশে পদক, এবং চলচ্চিত্রে
জাতীয় পুরস্কার।
কিন্তু পুরস্কারের চেয়ে বড় তাঁর একটি অর্জন: তিনি বাংলাদেশে বই পড়াকে জনপ্রিয় করেছিলেন।
একুশে বইমেলায় আজও যে ভিড়, তার একটা বড় অংশ তাঁরই তৈরি করা পাঠকশ্রেণি। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে
তাঁর নতুন বই বের হতো, আর সেটি কিনতে সকাল থেকে লাইন পড়ত — বাংলা সাহিত্যে এমন দৃশ্য বিরল।
জানেন কি?
হুমায়ূন আহমেদ পেশায় ছিলেন রসায়নের অধ্যাপক, আর পিএইচডি করেছিলেন পলিমার কেমিস্ট্রিতে। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ছিল বিজ্ঞানীর।
সাধারণ প্রশ্ন
হুমায়ূন আহমেদের হিমু চরিত্রটি কেমন?
হিমু হলুদ পাঞ্জাবি পরা, খালি পায়ে ঘুরে বেড়ানো এক তরুণ, যার কোনো চাকরি বা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। সে যুক্তির বদলে স্বজ্ঞায় চলে এবং সমাজের প্রচলিত নিয়মকে প্রশ্ন করে। চরিত্রটি নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলো হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিরিজগুলোর একটি।
মিসির আলি কে?
মিসির আলি মনোবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক, যিনি অতিপ্রাকৃত বলে দাবি করা ঘটনাগুলোর পেছনে যৌক্তিক ব্যাখ্যা খোঁজেন। হিমুর ঠিক বিপরীত এই চরিত্রটি হুমায়ূন আহমেদের অন্য প্রধান সিরিজ।
'বাকের ভাই'-এর জন্য মিছিল হয়েছিল কেন?
'কোথাও কেউ নেই' নাটকে বাকের ভাই চরিত্রটির ফাঁসির রায় হলে দর্শকেরা ঢাকার রাস্তায় মিছিল করেন এবং চরিত্রটিকে বাঁচানোর দাবি জানান। একটি কাল্পনিক চরিত্রকে নিয়ে এমন প্রতিক্রিয়া বাংলা টেলিভিশনের ইতিহাসে আর ঘটেনি।
হুমায়ূন আহমেদ পেশায় কী ছিলেন?
তিনি ছিলেন রসায়নের অধ্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে পড়াশোনা করে যুক্তরাষ্ট্রে পলিমার কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি করেন এবং দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। পরে পুরোপুরি লেখালেখিতে মনোনিবেশ করতে অধ্যাপনা ছেড়ে দেন।
নুহাশ পল্লী কী?
গাজীপুরে হুমায়ূন আহমেদের গড়া ব্যক্তিগত বাগানবাড়ি, যা তাঁর লেখার জায়গা ও চলচ্চিত্রের শুটিং স্পট হিসেবে ব্যবহৃত হতো। জ্যেষ্ঠ পুত্র নুহাশের নামে এর নামকরণ, এবং সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।


