Writer · Bangladesh
কাজী নজরুল ইসলাম
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬) — 'বিদ্রোহী' কবিতার স্রষ্টা, প্রায় চার হাজার গানের রচয়িতা, আর বাংলা সাহিত্যে সাম্য ও মানবতার সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বর।
Wikimedia Commonsকাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের সেই বিরল কণ্ঠস্বর, যিনি কবিতাকে প্রতিবাদের ভাষা আর গানকে
সাধারণ মানুষের সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছিলেন। বাংলাদেশে তিনি জাতীয় কবি, আর দুই বাংলাতেই তিনি
পরিচিত বিদ্রোহী কবি নামে — একটিমাত্র কবিতা যাঁর নামের সঙ্গে চিরকালের জন্য জুড়ে গেছে।
নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি
| Year | Work | Form | Translated as |
|---|---|---|---|
| 1922 | অগ্নিবীণা | কাব্যগ্রন্থ | Agnibeena |
| 1922 | ব্যথার দান | গল্পসংকলন | Byathar Dan |
| 1922 | যুগবাণী | প্রবন্ধ | Joog Bani |
| 1923 | দোলনচাঁপা | কাব্যগ্রন্থ | Dolan Chapa |
| 1923 | রাজবন্দীর জবানবন্দী | প্রবন্ধ | Rajbandir Jabanbandi |
| 1924 | বিষের বাঁশি | কাব্যগ্রন্থ | Bisher Bashi |
| 1924 | ভাঙার গান | কাব্যগ্রন্থ | Bhangar Gan |
| 1925 | চিত্তনামা | কাব্যগ্রন্থ | Chittanama |
| 1925 | ছায়ানট | কাব্যগ্রন্থ | Chhayanat |
| 1925 | সাম্যবাদী | কাব্যগ্রন্থ | Samyabadi |
| 1925 | রিক্তের বেদন | গল্পসংকলন | Rikter Bedon |
| 1926 | ঝিঙে ফুল | কাব্যগ্রন্থ | Jhinge Phul |
| 1926 | পুবের হাওয়া | কাব্যগ্রন্থ | Puber Hawa |
| 1926 | সর্বহারা | কাব্যগ্রন্থ | Sarbahara |
| 1926 | দুর্দিনের যাত্রী | প্রবন্ধ | Durdiner Jatri |
| 1927 | ফণী-মনসা | কাব্যগ্রন্থ | Phanimanasa |
| 1927 | বাঁধন হারা | উপন্যাস | Bandhan Hara |
| 1927 | রুদ্র-মঙ্গল | প্রবন্ধ | Rudra Mangal |
| 1928 | জিঞ্জীর | কাব্যগ্রন্থ | Jinjir |
| 1928 | সঞ্চিতা | কাব্যগ্রন্থ | Sanchita |
| 1928 | বুলবুল | গীতিসংকলন | Bulbul |
| 1929 | চক্রবাক | কাব্যগ্রন্থ | Chakrabak |
| 1929 | সন্ধ্যা | কাব্যগ্রন্থ | Sandhya |
| 1929 | চোখের চাতক | গীতিসংকলন | Chokher Chatak |
| 1930 | প্রলয় শিখা | কাব্যগ্রন্থ | Pralaya Shikha |
| 1930 | রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ (অনুবাদ) | কাব্যগ্রন্থ | Rubaiyat-e-Hafiz |
| 1930 | মৃত্যুক্ষুধা | উপন্যাস | Mrityukshuda |
| 1930 | ঝিলিমিলি | নাটক | Jhilimili |
| 1930 | নজরুল গীতিকা | গীতিসংকলন | Nazrul Geetika |
| 1931 | কুহেলিকা | উপন্যাস | Kuhelika |
| 1931 | শিউলিমালা | গল্পসংকলন | Shiulimala |
| 1931 | চন্দ্রবিন্দু | গীতিসংকলন | Chandrabindu |
| 1932 | জুলফিকার | গীতিসংকলন | Zulfiqar |
| 1932 | বনগীতি | গীতিসংকলন | Banageeti |
| 1932 | সুরসাকী | গীতিসংকলন | Sursaki |
| 1933 | কাব্য-আমপারা (অনুবাদ) | কাব্যগ্রন্থ | Kabya Ampara |
| 1933 | পুতুলের বিয়ে | নাটক | Putuler Biye |
| 1933 | গুল বাগিচা | গীতিসংকলন | Gul Bagicha |
| 1934 | গানের মালা | গীতিসংকলন | Ganer Mala |
| 1934 | গীতি শতদল | গীতিসংকলন | Geeti Shatadal |
| 1939 | নির্ঝর | কাব্যগ্রন্থ | Nirjhar |
| 1951 | মরুভাস্কর | কাব্যগ্রন্থ | Morubhaskar |
| 1952 | বুলবুল (দ্বিতীয় খণ্ড) | গীতিসংকলন | Bulbul (Part 2) |
| 1955 | সঞ্চয়ন | কাব্যগ্রন্থ | Sanchayan |
| 1958 | রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম (অনুবাদ) | কাব্যগ্রন্থ | Rubaiyat-i-Omar Khayyam |
| 1958 | শেষ সওগাত | কাব্যগ্রন্থ | Shesh Saogat |
| 1959 | মধুমালা | গীতিনাট্য | Madhumala |
| 1961 | ঝড় | কাব্যগ্রন্থ | Jhar |
| 1966 | রাঙা জবা | গীতিসংকলন | Ranga Jaba |
কর্মজীবনের সময়রেখা
- 1899
চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম
- 1917
ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান, করাচিতে অবস্থান
- 1922
'বিদ্রোহী' কবিতা প্রকাশ ও 'ধূমকেতু' পত্রিকার সূচনা
- 1923
রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কারাবরণ
- 1924
প্রমীলা দেবীর সঙ্গে বিবাহ
- 1942
দুরারোগ্য স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি হারান
- 1972
বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসে
- 1976
বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ; ২৯ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যু
জীবনী
জন্ম ও শৈশব
নজরুলের জন্ম ২৪ মে ১৮৯৯, বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে — আজকের ভারতের পশ্চিমবঙ্গে।
পরিবার ছিল দরিদ্র; বাবা কাজী ফকির আহমেদ মারা যান নজরুলের শৈশবেই, আর সংসারের ভার এসে পড়ে
কিশোর ছেলেটির কাঁধে। মক্তবে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি কাজ নেন মাজারের খাদেম হিসেবে, পরে রুটির
দোকানে।
এই সময়েই তিনি যোগ দেন লেটো দলে — গ্রামবাংলার ভ্রাম্যমাণ গানের দল, যেখানে গান বাঁধতে হয়
তাৎক্ষণিকভাবে, শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে এই মঞ্চই তাঁকে বেশি তৈরি
করেছিল: ছন্দ, সুর আর শ্রোতার নাড়ি বোঝার ক্ষমতা তিনি পেয়েছিলেন এখান থেকেই।
সেনাবাহিনী থেকে কলকাতা
১৯১৭ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে, নজরুল যোগ দেন ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টে এবং চলে যান
করাচিতে। সেনাছাউনির নিঃসঙ্গ সময়টাই হয়ে ওঠে তাঁর সাহিত্যজীবনের প্রস্তুতিপর্ব — সেখানে বসেই তিনি
পড়েন ফারসি কবিতা, শেখেন হাফিজ, আর লিখতে শুরু করেন।
যুদ্ধ শেষে ১৯২০ সালে সেনাবাহিনী ছেড়ে তিনি আসেন কলকাতায়, ঢুকে পড়েন সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের
জগতে। এর মাত্র দুই বছরের মধ্যেই বাংলা সাহিত্যের মানচিত্র বদলে যাবে।
'বিদ্রোহী' এবং তার মূল্য
১৯২২ সালে প্রকাশিত 'বিদ্রোহী' কবিতাটি বাংলা কবিতায় এমন এক স্বর নিয়ে আসে যা আগে শোনা যায়নি —
উচ্চকিত, আত্মবিশ্বাসী, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি। কবিতাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে নজরুল
পরিণত হন তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠস্বরে।
একই বছর তিনি প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক 'ধূমকেতু'। পত্রিকাটিতে প্রকাশিত রাজনৈতিক লেখার জন্য
ব্রিটিশ সরকার তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনে এবং তাঁকে কারাগারে পাঠায়। আদালতে
তিনি যে জবানবন্দি দেন — 'রাজবন্দীর জবানবন্দী' — সেটি আজও বাংলা গদ্যের অন্যতম সাহসী দলিল।
কারাগারে তিনি অনশনও করেছিলেন।
এখানেই নজরুলকে বোঝার আসল সূত্র: তাঁর বিদ্রোহ কেবল ব্রিটিশবিরোধী ছিল না। তিনি সমানভাবে আঘাত
করেছেন সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাত, নারীর অধীনতা আর ধর্মীয় ভণ্ডামিকে — এমন এক সময়ে, যখন এসব নিয়ে
কথা বলার মূল্য দিতে হতো।
গান: সবচেয়ে বড় কিন্তু কম আলোচিত অবদান
নজরুলকে সাধারণত কবি হিসেবে মনে রাখা হয়, কিন্তু সংখ্যার হিসাবে তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ গান —
প্রায় চার হাজার, যা নজরুলসংগীত নামে পরিচিত একটি স্বতন্ত্র ধারা।
এই বিপুল ভাণ্ডারের বৈচিত্র্যই সবচেয়ে অসাধারণ দিক। তিনি লিখেছেন ইসলামি গজল ও হামদ-নাত, আবার
একই কলমে লিখেছেন শ্যামাসংগীত — কালীভক্তির গান। রাগাশ্রয়ী গান লিখেছেন, আবার লিখেছেন
গণসংগীত ও প্রেমের গান। বাংলা সংগীতে সাম্প্রদায়িক সীমারেখা এভাবে অগ্রাহ্য করার নজির কার্যত আর
নেই।
তাঁর লেখা 'চল্ চল্ চল্' আজ বাংলাদেশের রণসংগীত।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯২৪ সালে নজরুল বিয়ে করেন প্রমীলা দেবীকে। হিন্দু-মুসলিম এই বিবাহ সে সময় দুই সম্প্রদায়েই
তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয় — কিন্তু নজরুল অবস্থান বদলাননি। তাঁদের সন্তানদের নামকরণেও তিনি একই
মিলনের চিহ্ন রেখেছিলেন। ব্যক্তিজীবনে তাঁকে বারবার শোক সইতে হয়েছে; দুই সন্তানের অকালমৃত্যু
তাঁর লেখায় গভীর ছাপ ফেলে।
নীরবতা
১৯৪২ সালে, মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে, নজরুল দুরারোগ্য এক স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হন। ধীরে ধীরে
তিনি হারান বাকশক্তি ও স্মৃতি। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে উচ্চকিত কণ্ঠ এরপর চৌত্রিশ বছর নীরব
ছিল — জীবনের প্রায় অর্ধেক সময়। চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভারত ও ইউরোপে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ফল
হয়নি।
১৯৭২ সালে, স্বাধীনতার পরপরই, বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসে এবং রাষ্ট্রীয়
মর্যাদায় তাঁর দায়িত্ব নেয়। ১৯৭৬ সালে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। একই বছর
২৯ আগস্ট তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী — নিজের এক গানেই তিনি লিখে গিয়েছিলেন মসজিদের পাশে সমাধির কথা — তাঁকে সমাহিত
করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে।
স্বীকৃতি ও উত্তরাধিকার
নজরুল পেয়েছেন ভারতের পদ্মভূষণ, বাংলাদেশের একুশে পদক (১৯৭৬) এবং মরণোত্তর
স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৭৭)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি-লিট প্রদান করে।
কিন্তু পুরস্কারের চেয়ে বড় তাঁর টিকে থাকা। একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত —
বাংলাদেশের প্রতিটি গণআন্দোলনে নজরুলের গান গাওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে,
কিন্তু 'কারার ঐ লৌহকপাট' আজও প্রতিবাদের ভাষা।
জানেন কি?
নজরুল একইসঙ্গে ইসলামি গজল আর শ্যামাসংগীত লিখেছেন — দুই ধারাতেই তিনি বাংলা সংগীতের অন্যতম প্রধান রচয়িতা। বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যে এমন উদাহরণ আর নেই।
সাধারণ প্রশ্ন
কাজী নজরুল ইসলামকে বিদ্রোহী কবি বলা হয় কেন?
১৯২২ সালে প্রকাশিত তাঁর 'বিদ্রোহী' কবিতাটি ঔপনিবেশিক শাসন ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে এমন সরাসরি ও উচ্চকিত ভাষায় লেখা, যা বাংলা কবিতায় আগে ছিল না। কবিতাটির নাম থেকেই উপাধিটি আসে, আর তাঁর পরবর্তী লেখা ও কারাবরণ সেটিকে স্থায়ী করে।
নজরুল বাংলাদেশের জাতীয় কবি হলেন কীভাবে, যদিও তাঁর জন্ম ভারতে?
জন্ম পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়ায় হলেও ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসে এবং ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গানের ভূমিকা ও বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা পান।
নজরুল কতগুলো গান লিখেছেন?
প্রায় চার হাজার, যা 'নজরুলসংগীত' নামে বাংলা সংগীতের একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে স্বীকৃত।
নজরুল কেন এত বছর নীরব ছিলেন?
১৯৪২ সালে, তেতাল্লিশ বছর বয়সে, তিনি এক দুরারোগ্য স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি ও স্মৃতি হারান। এরপর ১৯৭৬ সালে মৃত্যু পর্যন্ত চৌত্রিশ বছর তিনি আর লিখতে বা কথা বলতে পারেননি।
নজরুলের সমাধি কোথায়?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে। নিজের গানেই তিনি মসজিদের পাশে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে গিয়েছিলেন।


