Politician · Bangladesh
জিনাতুন নেসা তালুকদার
জিনাতুন নেসা তালুকদার ছিলেন বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ১৯৯৬–২০০১ মেয়াদে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জিনাতুন নেসা তালুকদার
জীবনী
জন্ম ও পরিবার
জিনাতুন নেসা তালুকদার ৯ জুলাই ১৯৪৭ সালে রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মৌলভী পারভেজ আলী মিয়া এবং মাতা জহুরা খাতুন। তাঁর স্বামী আবদুল্লাহিল বাকী তালুকদার ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী এবং রাজশাহী আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। তাঁদের দুই সন্তান ছিল।
শিক্ষাজীবন
তিনি ১৯৬৩ সালে রাজশাহীর সরকারি পিএন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে রাজশাহী কলেজে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৭২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক এবং ১৯৭৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে আইন বিষয়ে এলএলবি ও অ্যাডভোকেটশিপ সম্পন্ন করেন।
রাজনৈতিক জীবনের শুরু
কলেজজীবন থেকেই জিনাতুন নেসা তালুকদার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৬ সাল থেকে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ছয় দফা আন্দোলন ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময়ও তিনি ছাত্রলীগের নেত্রী হিসেবে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জিনাতুন নেসা তালুকদার সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। তিনি ভারতে গিয়ে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে কলকাতার গোবরা ক্যাম্পে অস্ত্র পরিচালনা ও চিকিৎসাসেবার প্রশিক্ষণ নেন। পরে ৭ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সাব-সেক্টরের অধীনে দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায়ও তিনি কাজ করেন।
শিক্ষকতা ও পেশাজীবন
স্বাধীনতার পর তিনি সমাজ ও শিক্ষা ক্ষেত্রে কাজ অব্যাহত রাখেন। ১৯৭৭ সালে নওহাটা ডিগ্রি কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে তাঁর পেশাজীবন শুরু হয়। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন।
রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দায়িত্ব
১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের রাজশাহী জেলা শাখায় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে তিনি মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতি এবং রাজশাহী মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী
১৯৯৬ সালের ৫ জুলাই তিনি সংরক্ষিত মহিলা আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। ১৯৯৭ সালে তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগের উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
শিক্ষা সম্প্রসারণে অবদানের জন্য তিনি ১৯৯৮ সালে মীর মশাররফ হোসেন পদক লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ২০১৩ সালে জাতীয় মহিলা সংস্থার সম্মাননা পান। নারী অধিকার বাস্তবায়নে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৮ সালে তিনি বেগম রোকেয়া পদক লাভ করেন।
মৃত্যু
জিনাতুন নেসা তালুকদার ২৯ অক্টোবর ২০২৩ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৭৬ বছর। তিনি হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। পরে রাজশাহীতে তাঁর বাবার কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
জিনাতুন নেসা তালুকদার বাংলাদেশের নারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি ছিলেন। ছাত্ররাজনীতি, ছয় দফা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষকতা, সংসদীয় রাজনীতি এবং নারী অধিকার—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিয়েছে।
জানেন কি?
তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী ছিলেন। কলকাতার গোবরা ক্যাম্পে তিনি অস্ত্র পরিচালনা ও চিকিৎসাসেবার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ১৯৯৬–২০০১ মেয়াদে তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

