Biography

Politician · Bangladesh

মিজানুর রহমান চৌধুরী

মিজানুর রহমান চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ নেতা ও দীর্ঘদিনের সংসদ সদস্য। তিনি ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মিজানুর রহমান চৌধুরীWikimedia Commons
৭৭বয়স

মিজানুর রহমান চৌধুরী

01

জীবনী

হালনাগাদ ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জন্ম ও পরিবার

মিজানুর রহমান চৌধুরী ১৯ অক্টোবর ১৯২৮ সালে তৎকালীন কুমিল্লা জেলার চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মোহাম্মদ হাফিজ চৌধুরী এবং মাতা মাহমুদা চৌধুরী। পরবর্তীতে চাঁদপুর তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

শিক্ষাজীবন

তিনি চাঁদপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং নুরিয়া হাই মাদ্রাসায় নিউ স্কিম কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৫২ সালে তিনি ফেনী কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষাজীবনের শুরুতেই তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ এলাকায় বামনী জুনিয়র হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। পরে সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও তা ছেড়ে চাঁদপুরের নুরিয়া হাই মাদ্রাসায় ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।

ছাত্ররাজনীতি

মিজানুর রহমান চৌধুরী ১৯৪৪ সালে ছাত্ররাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্ট লীগের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ১৯৪৫ সালে কুমিল্লা জেলা মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশনের নেতৃত্বে আসেন।

১৯৪৮ সালে তিনি চাঁদপুর মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং চাঁদপুর কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫০ সালে তিনি ফেনী কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

রাজনৈতিক জীবন

১৯৫৯ সালে মিজানুর রহমান চৌধুরী চাঁদপুর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে জননিরাপত্তা আইনে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়; পরে মুক্তি পেয়ে ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে আবার জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৬৬ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং পরে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ছয় দফা আন্দোলন সংগঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং ৭ জুন ১৯৬৬-এর হরতালের প্রধান সাংগঠনিক সমন্বয়কদের একজন ছিলেন। একই বছর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৬৭ সালে সুপ্রিম কোর্টের আদেশে মুক্তি পান। ১৯৬৮ সালে তিনি সম্মিলিত বিরোধী দল বা COP-এর আহ্বায়ক হন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানেও ভূমিকা রাখেন।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে মিজানুর রহমান চৌধুরী চাঁদপুরে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজে যুক্ত হন। ৩০ মার্চ তিনি আবদুল মালেক উকিলসহ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে আগরতলায় যান। পরে কলকাতায় গিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁকে দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

স্বাধীনতার পর মন্ত্রিত্ব

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে মিজানুর রহমান চৌধুরী বাংলাদেশের প্রথম দিকের মন্ত্রিসভায় তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

১৯৭৩ সালে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। একই বছর তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।

পরবর্তী রাজনৈতিক জীবন

১৯৭৯ সালের নির্বাচনে তিনি আবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি এরশাদ সরকারের সময় জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন।

১৯৮৫ সালে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে তিনি আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী

মিজানুর রহমান চৌধুরী ৯ জুলাই ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ২৭ মার্চ ১৯৮৮ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় তিনি সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

১৯৮৬ সালে তিনি জিম্বাবুয়ের হারারেতে অনুষ্ঠিত অষ্টম জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।

সংসদীয় জীবন

১৯৮৮ সালের নির্বাচনে তিনি আবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের উপনির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ—উভয় পর্যায়েই জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আওয়ামী লীগে প্রত্যাবর্তন

রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি একাধিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০১ সালে তিনি পুনরায় আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মৃত্যু

মিজানুর রহমান চৌধুরী ২ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৭৭ বছর। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব

মিজানুর রহমান চৌধুরী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন দীর্ঘকালীন ও বহুমাত্রিক রাজনীতিবিদ। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পরবর্তী সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

বিশেষ করে ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন তাঁকে দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থান দিয়েছে।

জানেন কি?

মিজানুর রহমান চৌধুরী ১৯৬২, ১৯৬৫ ও ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার পর তিনি ১৯৮৬ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন এবং ১৯৮৮ সালের ২৭ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

আরও রাজনীতিবিদ