Politician · Bangladesh
সিরাজ সিকদার (Siraj Sikder)
জন্ম: ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৪ জন্মস্থান: ভেদরগঞ্জ, শরীয়তপুর পেশা: প্রকৌশলী ও রাজনীতিক শিক্ষা: ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং রাজনৈতিক মতাদর্শ: মার্কসবাদী-লেনিনবাদী ও মাওবাদী ধারার বিপ্লবী রাজনীতি প্রতিষ্ঠাতা: পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি পদ: সর্বহারা পার্টির সভাপতি মৃত্যু: ২ জানুয়ারি ১৯৭৫ মৃত্যুস্থান: ঢাকা–সাভার এলাকায় পুলিশ হেফাজতে বয়স: প্রায় ৩০ বছর
সিরাজ সিকদার — পূর্ণ জীবনী
জীবনী
জন্ম ও পরিবার
সিরাজ সিকদার ১৯৪৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বরিশাল জেলার ভেদরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন, যা বর্তমানে শরীয়তপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত। তাঁর পিতা আবদুর রাজ্জাক সিকদার সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
শিক্ষাজীবন
সিরাজ সিকদার ১৯৫৯ সালে বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৬১ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে আইএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৬৭ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্ররাজনীতিতে প্রবেশ
শিক্ষাজীবনেই সিরাজ সিকদার বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ১৯৬৭ সালে ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি নির্বাচিত হন।
কর্মজীবন
১৯৬৭ সালে প্রকৌশলী হিসেবে তিনি সরকারি C&B বিভাগে চাকরিতে যোগ দেন। তবে প্রায় তিন মাস পর চাকরি ছেড়ে একটি বেসরকারি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে সেই চাকরিও ছেড়ে ঢাকায় মাও সে তুং গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন।
সরকারি চাপের কারণে গবেষণা কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গেলে ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ঢাকার টেকনিক্যাল ট্রেনিং কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।
পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন
ষাটের দশকের শেষদিকে সিরাজ সিকদার পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে ঔপনিবেশিক ও শোষণমূলক হিসেবে বিবেচনা করে বিপ্লবী আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হন। তিনি শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলেন।
এই আন্দোলনের রাজনৈতিক চিন্তায় মাওবাদী বিপ্লবের প্রভাব ছিল এবং সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পূর্ব বাংলায় একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সামনে রাখা হয়।
মুক্তিযুদ্ধ ও সশস্ত্র বাহিনী গঠন
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সিরাজ সিকদার দেশের অভ্যন্তরে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। ৩০ এপ্রিল ১৯৭১ বরিশালের স্বরূপকাঠিতে তিনি পূর্ব বাংলার সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনী গঠন করেন।
এই বাহিনী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম ছিল।
পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি
১৯৭১ সালের ৩ জুন স্বরূপকাঠির পেয়ারাবাগে সিরাজ সিকদার পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। শ্রমিক, কৃষক ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলাই ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি সর্বহারা পার্টির প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় এবং সিরাজ সিকদার দলের সভাপতি নির্বাচিত হন।
স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিরাজ সিকদার আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতির বিরোধিতা করেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন সর্বহারা পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের পথ অনুসরণ করে।
১৯৭৩ সালের এপ্রিলে তাঁর নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট গঠিত হয়। এরপর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালিত হয়।
রাজনৈতিক সংঘাত ও আত্মগোপন
১৯৭৪ সালের শেষদিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও কঠোর হয়ে ওঠে। ২৮ ডিসেম্বর ১৯৭৪ দেশে জরুরি অবস্থা জারি হলে সিরাজ সিকদার আত্মগোপনে চলে যান।
তাঁর সংগঠন ও রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতও এই সময় তীব্র হয়। সর্বহারা পার্টির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিভিন্ন সশস্ত্র হামলা ও পাল্টা দমনমূলক অভিযানের ইতিহাস জড়িয়ে আছে।
গ্রেপ্তার
১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সিরাজ সিকদার চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকা থেকে সরকারি গোয়েন্দা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। পরে তাকে বিমানযোগে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।
মৃত্যু
১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সাভারে রক্ষীবাহিনীর একটি ক্যাম্পে নেওয়ার পথে পুলিশ গুলিতে সিরাজ সিকদার নিহত হন বলে Banglapedia-তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তাই ঘটনাটিকে শুধু একটি একক বর্ণনার মাধ্যমে উপস্থাপন না করে এটি ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রাজনৈতিক দর্শন ও উত্তরাধিকার
সিরাজ সিকদার বাংলাদেশের বামপন্থী ও বিপ্লবী রাজনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত নাম। তিনি প্রচলিত সংসদীয় রাজনীতির পরিবর্তে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর নেতৃত্বাধীন বাহিনীর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড এবং স্বাধীনতার পর সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম—দুটি পর্যায়ই তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ও সর্বহারা পার্টির ইতিহাস বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতি এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচনায় এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

