Biography

Politician · Bangladesh

নূরজাহান মুর্শিদ

নূরজাহান মুর্শিদ ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও নারী অধিকারকর্মী। তিনি ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দিকের মন্ত্রিসভায় তিনি স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ন
৭৮বয়স
১পুরস্কার

নূরজাহান মুর্শিদ

01

জীবনী

হালনাগাদ ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জন্ম ও পরিবার

নূরজাহান মুর্শিদ ১৯২৪ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার তারানগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে সামান্য পার্থক্য রয়েছে; Banglapedia ১৯ মে ১৯২৪ উল্লেখ করেছে, আর অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে ২২ মে ১৯২৪ উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর পিতার নাম ছিল আয়ুব হোসেন বেগ এবং মাতার নাম বিবি খাতিমুন্নেসা। তিনি খান সারওয়ার মুর্শিদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে অর্থনীতিবিদ খান আহমেদ সায়ীদ মুর্শিদ ও ইতিহাসবিদ তাজীন মুর্শিদ উল্লেখযোগ্য।

শিক্ষাজীবন

নূরজাহান মুর্শিদের প্রাথমিক শিক্ষা নিজ এলাকায় শুরু হয়। পরে তিনি বরিশাল ও কলকাতায় পড়াশোনা করেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সে সময় মুসলিম নারীদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ ছিল তুলনামূলকভাবে বিরল; তিনি সেই প্রজন্মের অগ্রগামী শিক্ষিত নারীদের একজন ছিলেন।

শিক্ষকতা ও গণমাধ্যমে কর্মজীবন

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি বরিশালের সৈয়দুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং পরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। তিনি কামরুন্নেসা স্কুল, ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজ, হলি ক্রস কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

১৯৪৬ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওতে সম্প্রচারক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি ছিলেন সেখানে কর্মরত প্রথম দিকের মুসলিম নারী সম্প্রচারকদের একজন। দেশভাগের পর তিনি রেডিও পাকিস্তানেও কাজ করেন।

রাজনৈতিক জীবন

নূরজাহান মুর্শিদ ১৯৫০-এর দশকে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হন। নারী আইনপ্রণেতা হিসেবে তিনি আইন প্রণয়ন ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

পরবর্তীতে তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৮–৬৯ সালের গণআন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নূরজাহান মুর্শিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের স্বীকৃত প্রতিনিধি হিসেবে ভারতের রাজনৈতিক মহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন।

তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি. ভি. গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ভারতীয় সংসদের উভয় কক্ষে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেন। তাঁর এই কর্মকাণ্ডের কারণে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ তাঁকে অনুপস্থিতিতে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতি

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে নূরজাহান মুর্শিদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হন।

তিনি নারীর অধিকার, শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিন কাজ করেন। তিনি বাংলাদেশ মহিলা সমিতির প্রথম সভাপতি ছিলেন। এছাড়া তিনি আগ্রণী বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং BIRDEM-এর প্রতিষ্ঠাকালীন উদ্যোগেও ভূমিকা রাখেন।

সাংবাদিকতা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড

১৯৮০-এর দশকে তিনি ‘একালের’ নামে একটি বাংলা সাময়িকী প্রকাশ ও সম্পাদনা করেন। পরে এর নাম হয় ‘এদেশ-একাল’। পত্রিকাটিতে নারীসমাজের সমস্যা ছাড়াও বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা প্রকাশিত হতো।

তিনি আজীবন নারী ক্ষমতায়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক চেতনার পক্ষে কাজ করেন।

মৃত্যু

নূরজাহান মুর্শিদ ১ সেপ্টেম্বর ২০০৩ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও নারী অধিকার, শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর অবদান স্মরণ করা হয়। তাঁকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

পুরস্কার ও সম্মাননা

নূরজাহান মুর্শিদকে মরণোত্তর ২০১৩ সালে সমাজসেবায় একুশে পদক প্রদান করা হয়।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব

নূরজাহান মুর্শিদ ছিলেন বাংলাদেশের নারী রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম অগ্রদূত। শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, নারী অধিকার আন্দোলন, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একজন নারী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

জানেন কি?

১৯৫৪ সালে তিনি যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের পক্ষে ভারতের সংসদে বাংলাদেশের স্বীকৃতির জন্য বক্তব্য দেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দিকের মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ মহিলা সমিতির প্রথম সভাপতি ছিলেন। ২০১৩ সালে তিনি মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।

আরও রাজনীতিবিদ