Politician · Bangladesh
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, শিক্ষাবিদ, ভাষাসংগ্রামী ও বিশিষ্ট লেখক। তিনি আইন, ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও ধর্ম নিয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন।
Wikimedia Commonsমুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
জীবনী
জন্ম ও পরিবার
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ৩ ডিসেম্বর ১৯২৮ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গীপুর মহকুমার দয়ারামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৌলভী জহিরউদ্দিন বিশ্বাস ছিলেন একজন আইনজীবী এবং তাঁর মা ছিলেন গুল হাবিবা। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার প্রথমে নবাবগঞ্জ এবং পরে রাজশাহীতে বসবাস শুরু করে।
শিক্ষাজীবন
তিনি ১৯৪৫ সালে জঙ্গীপুর হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯৪৭ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫০ সালে ইতিহাসে বি.এ. (অনার্স), ১৯৫১ সালে এম.এ. এবং ১৯৫৫ সালে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উরস্টার কলেজ থেকে আধুনিক ইতিহাসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং ১৯৫৯ সালে লিংকনস ইন থেকে বার-অ্যাট-ল সম্পন্ন করেন।
ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী জীবনেও বাংলা ভাষার ব্যবহার ও বিকাশ নিয়ে তিনি কাজ করেন।
শিক্ষকতা ও আইন পেশা
১৯৫২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে আইন অনুষদের ডিন এবং ইতিহাসের রিডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে আইন পেশায় যোগ দেন এবং ঢাকা হাইকোর্ট বারে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি সহকারী অ্যাডভোকেট জেনারেল, হাইকোর্ট আইনজীবী সমিতির সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন।
বিচারক হিসেবে কর্মজীবন
১৯৭৬ সালে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বাংলাদেশ হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৮৫ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হন। ১৯৯০–৯১ সালে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং একই বছর অবসর নেন।
বিচারপতি হিসেবে তিনি সংবিধান, নাগরিকত্ব, হেবিয়াস কর্পাস, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, আদালতের এখতিয়ার ও অ্যাডমিরালটি জুরিসডিকশনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়ে রায় ও মতামত প্রদান করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা
১৯৯৫ সালে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী তিনি ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৩০ মার্চ ১৯৯৬ থেকে ২৩ জুন ১৯৯৬ পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করে।
সাহিত্য ও গবেষণা
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ছিলেন বহুমাত্রিক লেখক। আইন, ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, ধর্ম, রাজনীতি ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি ব্যাপকভাবে লিখেছেন। তাঁর বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোর মধ্যে যথাশব্দ, মাতৃভাষার পক্ষে রবীন্দ্রনাথ, বচন ও প্রবচন, গঙ্গারিডি থেকে বাংলাদেশ, কোরআন-সূত্র এবং কোরআন শরীফ সরল বঙ্গানুবাদ উল্লেখযোগ্য।
১৯৭৪ সালে প্রকাশিত যথাশব্দ বাংলা ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ থিসরাস হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন। বিভিন্ন সূত্রে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭০-এর বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুরস্কার ও সম্মাননা
সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চায় অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদক প্রদান করে। তিনি বাংলা একাডেমি, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ এবং অক্সফোর্ডের উরস্টার কলেজের ফেলো ছিলেন।
মৃত্যু
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ১১ জানুয়ারি ২০১৪ সালে ঢাকার একটি হাসপাতালে ৮৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে একটি উল্লেখযোগ্য শূন্যতা সৃষ্টি করে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে বিচারপতি, শিক্ষাবিদ, ভাষাসংগ্রামী ও লেখক—এই বহুমাত্রিক পরিচয়ের জন্য স্মরণীয়। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে তাঁর ভূমিকা এবং ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নির্বাচন পরিচালনায় তাঁর দায়িত্ব দেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। একই সঙ্গে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী অবদান তাঁকে একজন বিশিষ্ট মননশীল ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
জানেন কি?
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এবং পরের বছর ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলা ভাষার প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ থিসরাস “যথাশব্দ”-এর রচয়িতা।

