Politician · Bangladesh
মশিউর রহমান
মশিউর রহমান, ‘যাদু মিয়া’ নামে পরিচিত, ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও ন্যাপ নেতা। তিনি ১৯৭৮ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং জিয়াউর রহমানের সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রী পদমর্যাদার জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
Wikimedia Commonsমশিউর রহমান
জীবনী
জন্ম ও পরিবার
মশিউর রহমান, যিনি ‘যাদু মিয়া’ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন, ৯ জুলাই ১৯২৪ সালে তৎকালীন রংপুর জেলার ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ওসমান গণি এবং মাতা আবিউন্নেসা। বর্তমানে তাঁর জন্মস্থান নীলফামারী জেলার অন্তর্ভুক্ত।
শিক্ষাজীবন
মশিউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
প্রাথমিক রাজনৈতিক জীবন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ১৯৪০-এর দশকে রংপুর অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ও রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি পরিচিতি লাভ করেন।
রাজনীতির শুরুতে তিনি মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈতিক আদর্শে প্রভাবিত হয়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) রাজনীতিতে যোগ দেন।
ন্যাপের রাজনীতি
মশিউর রহমান মওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী হয়ে ওঠেন। ষাটের দশকে তিনি ন্যাপের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬২ সালে তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিরোধীদলীয় উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। আইয়ুব খানের শাসনবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে তিনি গ্রেপ্তারও হন।
গণতান্ত্রিক আন্দোলন
আইয়ুববিরোধী আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে মশিউর রহমান সক্রিয় ছিলেন। তিনি ন্যাপের পক্ষে সংসদ ও রাজপথ—উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।
ষাটের দশকের শেষ দিকে তিনি ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক হন এবং মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকে পরিণত হন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে মশিউর রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে ভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়। কিছু সূত্রে তাঁকে স্বাধীনতার পক্ষে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও জনসমাবেশে সক্রিয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, আবার তাঁর মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ডের কিছু দিক নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। তাই এ সময়ের ভূমিকা মূল্যায়নে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মওলানা ভাসানীর উত্তরসূরি হিসেবে নেতৃত্ব
১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর মশিউর রহমান ন্যাপের ভাসানী-সমর্থিত অংশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি দলটির সভাপতি হিসেবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান।
বিএনপি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় মশিউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগে তিনি যুক্ত হন।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলে মশিউর রহমান প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন।
জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব
২৯ জুন ১৯৭৮ সালে মশিউর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী পদমর্যাদা ও মর্যাদায় জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি রেলপথ, সড়ক ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
এই দায়িত্বে তিনি ১২ মার্চ ১৯৭৯ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহাল ছিলেন।
সংসদীয় জীবন
১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি রংপুর-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে নির্বাচনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হওয়ায় সংসদীয় দায়িত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
মৃত্যু
মশিউর রহমান ১২ মার্চ ১৯৭৯ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৫৪ বছর।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
মশিউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘যাদু মিয়া’ নামে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ন্যাপের রাজনীতি, মওলানা ভাসানীর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং ১৯৭৮ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাঁর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একই সঙ্গে তাঁর ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে মতপার্থক্য থাকায় তাঁর রাজনৈতিক জীবন মূল্যায়নে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।
জানেন কি?
* মশিউর রহমান ‘যাদু মিয়া’ নামে পরিচিত ছিলেন। * তিনি ৯ জুলাই ১৯২৪ সালে ডিমলার খগাখড়িবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। * ১৯৬২ সালে তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। * তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী ছিলেন। * ১৯৭৬ সালে ভাসানীর মৃত্যুর পর তিনি ন্যাপের নেতৃত্বে আসেন। * ১৯৭৮ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। * ২৯ জুন ১৯৭৮ থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী পদমর্যাদার জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ছিলেন। * ১২ মার্চ ১৯৭৯ সালে ৫৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

