Biography

Politician · Bangladesh

মুহাম্মদ আতাউল গনী ওসমানী (এম. এ. জি. ওসমানী)

জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী (১ সেপ্টেম্বর ১৯১৮–১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সামরিক নেতা। তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মজীবন শুরু করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বার্মা অভিযানে অংশ নেন এবং পরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে কর্নেল পদমর্যাদায় অবসর নেওয়ার পর রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত হন। স্বাধীনতার পর তিনি জেনারেল পদমর্যাদায় বাংলাদেশের সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন এবং পরবর্তীতে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মুহাম্মদ আতাউল গনী ওসমানী (এম. এ. জি. ওসমানী)Wikimedia Commons
৬৫বয়স
১পুরস্কার

এম. এ. জি. ওসমানী

জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গনী ওসমানী, সংক্ষেপে এম. এ. জি. ওসমানী, ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, সামরিক কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি বাংলাদেশ বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে সামরিক নেতৃত্ব দেন। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রথম কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

01

জীবনী

হালনাগাদ ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জন্ম ও শৈশব

এম. এ. জি. ওসমানী ১ সেপ্টেম্বর ১৯১৮ সালে তৎকালীন আসাম প্রদেশের সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক শিকড় ছিল সিলেট অঞ্চলে। তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে শাহ জালালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শাহ নিজামউদ্দিন ওসমানীর নাম উল্লেখ করা হয়। তাঁর পৈতৃক এলাকা বর্তমানে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার দিয়ামীর ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।

শৈশবে তিনি সিলেটের কটন স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং পরে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় তাঁর ভালো দক্ষতা ছিল এবং শিক্ষাজীবনে তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দেন।

উচ্চশিক্ষা

ওসমানী আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৩৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি সামরিক পেশায় প্রবেশের জন্য ভারতীয় সামরিক একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন।

ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মজীবন

১৯৩৯ সালে ওসমানী ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি সামরিক দায়িত্ব পালন করেন এবং বার্মা অভিযানে অংশ নেন। যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা তাঁর সামরিক নেতৃত্ব ও কৌশলগত দক্ষতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদে দায়িত্ব পালন করেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মজীবন

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ওসমানী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ইউনিট ও সদর দপ্তরে কাজ করেন। তিনি সামরিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও অপারেশনসংক্রান্ত বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬১ সালে তিনি স্থায়ীভাবে কর্নেল পদে উন্নীত হন।

তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সামরিক অপারেশনস-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও ছিলেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধেও তিনি সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। দীর্ঘ সামরিক জীবনের পর ১৯৬৭ সালে কর্নেল পদমর্যাদায় অবসর গ্রহণ করেন।

রাজনীতিতে প্রবেশ

সামরিক জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর ওসমানী পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সিলেটের বালাগঞ্জ-ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকার আসন থেকে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত হন। তবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে কার্যত দায়িত্ব পালন করতে পারেননি।

মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক

১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হলে ওসমানী মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন।

১২ এপ্রিল ১৯৭১ তিনি বাংলাদেশ সরকারের অধীনে গঠিত বাংলাদেশ বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ নিযুক্ত হন। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় তিনি মুক্তিবাহিনীর সামরিক কর্মকাণ্ডের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব দেন।

তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কাঠামো আরও সুসংগঠিত হয়। মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন সেক্টর ও বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়, সামরিক পরিকল্পনা এবং যুদ্ধ পরিচালনায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের কারণে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘বঙ্গবীর’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁকে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

স্বাধীনতার পর সামরিক জীবন

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ওসমানী বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মেয়াদ ছিল ১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল থেকে ১৯৭২ সালের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত।

১৯৭২ সালে তিনি চার তারকা জেনারেল হিসেবে সামরিক জীবন থেকে অবসর নেন। স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রাথমিক কাঠামো ও পেশাদার সামরিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক জীবন ও মন্ত্রিত্ব

সামরিক জীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর ওসমানী স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে সিলেট-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের মন্ত্রিসভায় তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি নৌপরিবহন, জাহাজ চলাচল ও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন। তাঁর মন্ত্রিত্বের সময়কাল ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে বিস্তৃত ছিল।

রাজনৈতিক মতপার্থক্য

পরবর্তীতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ওসমানীর সঙ্গে সরকারের মতপার্থক্য তৈরি হয়। তিনি সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেন।

১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি সামরিক ও বেসামরিক শাসনব্যবস্থা এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সক্রিয় ছিলেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা

মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এম. এ. জি. ওসমানীকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করা হয়। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক পরিচিত সামরিক নেতাদের একজন হিসেবে স্মরণীয়।

মৃত্যু

এম. এ. জি. ওসমানী ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৬৫ বছর। পরবর্তীতে তাঁকে সিলেটে হযরত শাহজালালের দরগাহসংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

প্রতি বছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী ও জন্মবার্ষিকীতে বাংলাদেশে, বিশেষ করে সিলেটে, বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

উত্তরাধিকার

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সামরিক ইতিহাসে এম. এ. জি. ওসমানীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধের সামরিক সংগঠন ও পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রাথমিক কাঠামো গঠনে তাঁর ভূমিকা স্মরণ করা হয়।

তাঁর দীর্ঘ সামরিক জীবন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী—এই তিন ঐতিহাসিক পর্যায়কে অতিক্রম করেছে। এই কারণে তিনি বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হন।

জানেন কি?

এম. এ. জি. ওসমানীর ডাকনাম ছিল ‘বঙ্গবীর’। তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ ছিলেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বার্মা অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি সিলেট-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯১৮ এবং মৃত্যু ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪।

আরও রাজনীতিবিদ