Politician · Bangladesh
লতিফুর রহমান
লতিফুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট উদ্যোক্তা ও ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তিনি স্বাধীন গণমাধ্যম ও নৈতিক ব্যবসায়িক চর্চার জন্যও পরিচিত ছিলেন।
লতিফুর রহমান
জীবনী
জন্ম ও পরিবার
লতিফুর রহমান ২৮ আগস্ট ১৯৪৫ সালে ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশবের একটি বড় অংশ ঢাকার গেন্ডারিয়ায় কাটে। তাঁর পিতা ছিলেন খান বাহাদুর মজিবুর রহমান এবং মা বেগম সাকেরা বানু।
তিনি শাহনাজ রহমানকে বিয়ে করেন। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে ছিলেন সিমিন রহমান, শাহজরেহ হক, শাজনীন রহমান ও আরশাদ ওয়ালিউর রহমান।
শিক্ষাজীবন
লতিফুর রহমান সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে ভারতের শিলংয়ের সেন্ট এডমন্ডস স্কুল এবং কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়াশোনা করেন।
কর্মজীবনের শুরু
১৯৬৬ সালে তিনি পরিবারের মালিকানাধীন চাঁদপুরের ডব্লিউ রহমান জুট মিলে ট্রেইনি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে সেখানে নির্বাহী পদে কাজ করেন এবং ১৯৭১ সাল পর্যন্ত জুট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭২ সালে জুট মিলটি জাতীয়করণ হওয়ার পর তাঁকে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করতে হয়।
ট্রান্সকম গ্রুপ প্রতিষ্ঠা
জাতীয়করণের পর লতিফুর রহমান ট্রেডিং ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে তাঁর উদ্যোগে আধুনিক ট্রান্সকম ব্যবসার ভিত্তি তৈরি হয় এবং ১৯৮১ সালে ট্রান্সকম লিমিটেড আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, পানীয়, খাদ্য, ভোক্তাপণ্য, বিতরণ ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত হয়।
১৯৮০-এর দশকে তিনি নেসলের পণ্য বাংলাদেশে আমদানি ও বিতরণের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে স্মিথ, ক্লাইন অ্যান্ড ফ্রেঞ্চের বাংলাদেশ কার্যক্রম অধিগ্রহণ করে সেটিকে এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস হিসেবে গড়ে তোলেন।
গণমাধ্যমে অবদান
লতিফুর রহমান বাংলাদেশের বেসরকারি গণমাধ্যমের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি মিডিয়াওয়ার্ল্ডের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন, যে প্রতিষ্ঠান দ্য ডেইলি স্টার-এর মালিকানার সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া তিনি মিডিয়াস্টারের চেয়ারম্যান ছিলেন, যে প্রতিষ্ঠান প্রথম আলো প্রকাশ করে।
ট্রান্সকমের ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে দ্য ডেইলি স্টার প্রতিষ্ঠার সময় ট্রান্সকমের উল্লেখযোগ্য অংশীদারিত্ব ছিল এবং ১৯৯৩ সালে মিডিয়াস্টারের মাধ্যমে প্রথম আলো প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ব্যবসায়িক ও সাংগঠনিক ভূমিকা
লতিফুর রহমান মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (MCCI), ঢাকা-এর সভাপতি হিসেবে সাত মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতিও ছিলেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক চেম্বার অব কমার্সের (ICC) প্যারিসভিত্তিক নির্বাহী বোর্ডে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী বোর্ডের সদস্য, বাংলাদেশ সরকারের ট্রেড বডি রিফর্মস কমিটির চেয়ারম্যান এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
লতিফুর রহমান ২০১২ সালে Oslo Business for Peace Award লাভ করেন। নৈতিক ব্যবসায়িক নেতৃত্বের জন্য এই আন্তর্জাতিক পুরস্কার তাঁকে বিশ্ব ব্যবসায়িক অঙ্গনে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। তিনি এই সম্মান পাওয়া বাংলাদেশের প্রথম উদ্যোক্তা ছিলেন।
এছাড়া তিনি ২০০১ সালে American Chamber of Commerce in Bangladesh-এর Business Executive of the Year পুরস্কার এবং পরবর্তীতে SAARC Outstanding Leader Award ও Lifetime Achievement Award লাভ করেন।
মৃত্যু
লতিফুর রহমান ১ জুলাই ২০২০ সালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের চিওড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে ঘুমের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ফুসফুসজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৭৫ বছর। পরে তাঁকে ঢাকার বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
লতিফুর রহমান বাংলাদেশের ব্যবসায়িক অঙ্গনে একজন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোক্তা হিসেবে স্মরণীয়। শূন্য থেকে ট্রান্সকমকে বৃহৎ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পাশাপাশি তিনি স্বাধীন গণমাধ্যম ও নৈতিক ব্যবসায়িক চর্চার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
জানেন কি?
লতিফুর রহমান ২০১২ সালে Oslo Business for Peace Award লাভ করেন এবং এই পুরস্কার পাওয়া বাংলাদেশের প্রথম উদ্যোক্তা ছিলেন।

