Biography

Politician · Bangladesh

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী (Humayun Rashid Choudhury)

জন্ম: ১১ নভেম্বর ১৯২৮ জন্মস্থান: সিলেট, বাংলাদেশ পেশা: কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ শিক্ষা: আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডনের ইনার টেম্পল, লন্ডন ইনস্টিটিউট অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স, ফ্লেচার স্কুল মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা: দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের প্রধান সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী: ১৯৮৫–১৯৮৮ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি: ৪১তম অধিবেশন, ১৯৮৬ সাবেক সংসদ সদস্য: ১৯৮৬, ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সাবেক জাতীয় সংসদ স্পিকার: ১৯৯৬–২০০১ মৃত্যু: ১০ জুলাই ২০০১, ঢাকা

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী (Humayun Rashid Choudhury)Wikimedia Commons
৭২বয়স
১পুরস্কার

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী — পূর্ণ জীবনী

01

জীবনী

হালনাগাদ ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জন্ম ও পরিবার

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ১৯২৮ সালের ১১ নভেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অন্যতম অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, কূটনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং সংসদীয় রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।

শিক্ষাজীবন

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ১৯৪৭ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি লন্ডনে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং ইনার টেম্পলের সদস্য হন। লন্ডন ইনস্টিটিউট অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের ফ্লেচার স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসিতে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন।

কূটনৈতিক জীবনের সূচনা

১৯৫৩ সালে তিনি পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন। কূটনীতিক হিসেবে তিনি রোম, বাগদাদ, প্যারিস, লিসবন ও জাকার্তাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কর্মজীবনে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক আলোচনায় দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী পাকিস্তানের কূটনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই সময় তিনি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা করেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য কাজ করেন। জাতিসংঘের জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দিল্লিতে তাঁর দায়িত্বকালে তিনি ৪০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা করেন।

স্বাধীনতার পর কূটনৈতিক দায়িত্ব

স্বাধীনতার পর হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বাংলাদেশের কূটনৈতিক কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭২ সালে তিনি জার্মানিতে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও হলি সি-তে তাঁর সমবর্তী দায়িত্ব ছিল।

তিনি পরবর্তীতে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA) ও জাতিসংঘ শিল্প উন্নয়ন সংস্থায় (UNIDO) বাংলাদেশের প্রথম স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী

১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৮৫–১৯৮৮ সময়কালে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর আন্তর্জাতিক জীবনের অন্যতম বড় অর্জন ছিল ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া। তিনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদে অধিষ্ঠিত প্রথম দিকের অন্যতম বিশিষ্ট কূটনীতিক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।

জাতিসংঘের বিভিন্ন নথিতে তাঁকে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কূটনীতিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ব শান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় তাঁর কূটনৈতিক অবদানের জন্য ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে মহাত্মা গান্ধী শান্তি পুরস্কার প্রদান করে।

রাজনৈতিক জীবন

কূটনৈতিক জীবনের পাশাপাশি হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বাংলাদেশের রাজনীতিতেও সক্রিয় হন। ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

জাতীয় সংসদের স্পিকার

১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালন করেন। জাতিসংঘও তাঁর মৃত্যুসংক্রান্ত বিবৃতিতে তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বহুভাষিক দক্ষতা

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী একাধিক ভাষায় দক্ষ ছিলেন। জাতিসংঘের জীবনী অনুযায়ী তিনি বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফরাসি ও ইতালীয় ভাষায় সাবলীল ছিলেন এবং আরবি, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, জার্মান ও বাহাসা ইন্দোনেশিয়ান ভাষায়ও কাজ চালানোর মতো জ্ঞান রাখতেন।

মৃত্যু

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ২০০১ সালের ১০ জুলাই ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁকে স্মরণ করে শোকবার্তা দেওয়া হয় এবং তাঁর সম্মানে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। জাতিসংঘের বিবৃতিতে তাঁকে বাংলাদেশের একজন দক্ষ কূটনীতিক ও জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে স্মরণ করা হয়।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব

বাংলাদেশের ইতিহাসে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর গুরুত্ব বহুমাত্রিক। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে তাঁর কূটনৈতিক ভূমিকা, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কাজ এবং ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া—সব মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।

পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবেও তিনি সংসদীয় প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্ব দেন। তাঁর কর্মজীবন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

জানেন কি?

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের প্রধান হিসেবে কাজ করেন এবং বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায়ে আলোচনা করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে জার্মানিতে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ১৯৮৫–১৯৮৮ সময়কালে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর সময়ও এই পদে ছিলেন। ১৯৮৪ সালে তিনি মহাত্মা গান্ধী শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।

আরও রাজনীতিবিদ