Politician · Bangladesh
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (১৯৪০–২০২৩) ছিলেন বাংলাদেশের একজন ইসলামী বক্তা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিবিদ। তিনি পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ছিলেন।
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী — পূর্ণ জীবনী
জীবনী
জন্ম ও পরিবার
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৪০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পিরোজপুর জেলার সাঈদখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ইউসুফ সাঈদী ছিলেন একজন আলেম, শিক্ষক ও ধর্মীয় প্রচারক। তাঁর পারিবারিক নাম ও জন্মতারিখ নিয়ে কিছু উৎসে সামান্য পার্থক্য দেখা যায়; অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য জীবনীমূলক সূত্রে ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০ তারিখটি উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি সালেহা সাঈদীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের চার সন্তান—রফীক, শামীম, মাসুদ ও নাসিম।
শিক্ষাজীবন
শৈশবে তিনি পিতার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে ছারছিনা আলিয়া মাদ্রাসা ও খুলনা আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি ও অন্যান্য বিষয়ে অধ্যয়ন করেন।
ধর্মীয় বক্তা হিসেবে পরিচিতি
রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে সাঈদী দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ মাহফিলে কোরআন ও ইসলামী বিষয়ের ওপর বক্তৃতা দিয়ে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর বক্তৃতা ও ধর্মীয় আলোচনা বাংলাদেশের বাইরে বিভিন্ন দেশেও শ্রোতাদের কাছে পৌঁছায়।
রাজনৈতিক জীবন
সাঈদী ১৯৭০-এর দশক থেকে ইসলামী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রুকন হন। পরবর্তীতে তিনি দলের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর হন এবং ২০২৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ পদে ছিলেন।
সংসদ সদস্য
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পিরোজপুর-১ আসন থেকে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের মামলা
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১৩ সালে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। রায়টি দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া, বিক্ষোভ ও সংঘাত সৃষ্টি করে।
২০১৪ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বিচারপ্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ ও সমর্থকেরা রায়কে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করে।
লেখালেখি
সাঈদী ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয় নিয়ে বেশ কিছু বই লিখেছেন। তাঁর রচনায় কোরআন, হাদিস, ইসলামি জীবনব্যবস্থা, নৈতিকতা ও সামাজিক বিষয় স্থান পেয়েছে। বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭০-এর বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মৃত্যু
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট কারাগারে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন। পরে তাঁকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়। ১৪ আগস্ট ২০২৩ রাত ৮টা ৪০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।
পরে পিরোজপুরে তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির একজন বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ধর্মীয় বক্তা হিসেবে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তার পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকা তাঁকে বাংলাদেশের সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত চরিত্রে পরিণত করে। তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও পরবর্তী রায়ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।
জানেন কি?
তিনি পিরোজপুর-১ আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর হন। ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল; ২০১৪ সালে আপিল বিভাগ সেই সাজা আমৃত্যু কারাদণ্ডে পরিবর্তন করে। ১৪ আগস্ট ২০২৩ সালে ৮৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

