Politician · Bangladesh
আতাউর রহমান খান
আতাউর রহমান খান (১৯০৫–১৯৯১) ছিলেন বাংলাদেশের আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও লেখক। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
Wikimedia Commonsআতাউর রহমান খান — পূর্ণ জীবনী
জীবনী
জন্ম ও পরিবার
আতাউর রহমান খান ১৯০৫ সালের ৬ মার্চ ঢাকার ধামরাইয়ের বালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন। তাঁর পুত্র ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমান খান পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং সংসদ সদস্য ছিলেন।
শিক্ষাজীবন
তিনি ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে ১৯২৪ সালে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। এরপর জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯২৭ সালে স্নাতক হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অর্থনীতি ও আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে আইন পেশায় যুক্ত হন।
রাজনৈতিক জীবনের সূচনা
আতাউর রহমান খান ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি প্রথমদিকে মুসলিম লীগের সঙ্গে রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং ১৯৪৬ সালে দলটির যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। দেশভাগের পর তিনি পূর্ব বাংলার স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
আওয়ামী লীগ ও ভাষা আন্দোলন
১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সময় আতাউর রহমান খান দলটির অন্যতম নেতা হিসেবে যুক্ত হন। তিনি ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সদস্য ও আহ্বায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
যুক্তফ্রন্ট ও মন্ত্রিত্ব
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর এ. কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট সরকারে বেসামরিক সরবরাহ-সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী
১৯৫৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খান পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হন। তাঁর মন্ত্রিসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারির মাধ্যমে তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটে।
গণতান্ত্রিক আন্দোলন
১৯৬২ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের অন্যতম নেতা হিসেবে তিনি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৬৫ সালের নির্বাচনে তিনি সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি আবারও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এ সময় তিনি জাতীয় লীগ গঠন করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতি
স্বাধীনতার পর আতাউর রহমান খান বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবং ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি সংসদে বিরোধীদলীয় নেতৃত্বের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী
১৯৮৪ সালের ৩০ মার্চ রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আতাউর রহমান খানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সংসদবিষয়ক বিষয়ের দায়িত্বও পালন করেন। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্ব ১৯৮৫ সালের জানুয়ারিতে শেষ হয়।
এরশাদ সরকারের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে পরবর্তী সময়ে সমালোচনা থাকলেও তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন।
লেখালেখি
রাজনীতির পাশাপাশি আতাউর রহমান খান ছিলেন একজন লেখক। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- ওজারতির দুই বছর
- স্বৈরাচারের দশ বছর
- প্রধানমন্ত্রিত্বের নয় মাস
- অবরুদ্ধ নয় মাস
তাঁর লেখায় সমকালীন রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার নানা দিক উঠে এসেছে।
মৃত্যু
আতাউর রহমান খান ১৯৯১ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৮৬ বছর। তাঁকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার অভ্যন্তরে সমাহিত করা হয়।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
আতাউর রহমান খান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের রাজনীতি, পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রিত্ব, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল। একই সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক স্মৃতিকথা ও গ্রন্থগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
জানেন কি?
তিনি ১৯৫৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হন। তাঁর মন্ত্রিসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি রাজনীতির পাশাপাশি একাধিক রাজনৈতিক ও আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করেন।

