Politician · Bangladesh
মোহাম্মদ আবুল কাসেম
মোহাম্মদ আবুল কাসেম ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অগ্রদূত, শিক্ষাবিদ, লেখক ও রাজনীতিবিদ। তিনি তমদ্দুন মজলিশ প্রতিষ্ঠা এবং বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
Wikimedia Commonsমোহাম্মদ আবুল কাসেম
জীবনী
জন্ম ও পরিবার
মোহাম্মদ আবুল কাসেম ২৮ জুন ১৯২০ সালে চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার বরমা এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পরবর্তীকালে ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম’ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত হন।
শিক্ষাজীবন
১৯৩৯ সালে তিনি বরমা ত্রাহি-মেনকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৪১ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে বিএসসি (অনার্স) এবং ১৯৪৫ সালে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর এমএসসি গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ও গণিতবিদ সত্যেন্দ্রনাথ বসু।
শিক্ষকতা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান
১৯৪৬ সালে আবুল কাসেম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষার পাঠ্যবই প্রণয়ন ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলার প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব দেন।
১৯৬২ সালে তাঁর উদ্যোগে ঢাকার মিরপুরে বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ১৯৮১ সাল পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শিক্ষাভাবনার অন্যতম লক্ষ্য ছিল উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি করা।
ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বাংলার পক্ষে আন্দোলন গড়ে তুলতে আবুল কাসেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি তমদ্দুন মজলিশ প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটি বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করতে কাজ করে।
১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তাঁর সম্পাদনায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা: বাংলা না উর্দু?’ শিরোনামের পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। এতে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার পাশাপাশি শিক্ষা, আদালত ও সরকারি কাজে বাংলার ব্যবহারের দাবি তুলে ধরা হয়।
তিনি ১৯৪৭ সালের ১ অক্টোবর প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম মুখপত্র হিসেবে সাপ্তাহিক সৈনিক প্রকাশের উদ্যোগ নেন।
রাজনীতি
আবুল কাসেম সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রামের পটিয়া-বোয়ালখালী আসন থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৫৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রাদেশিক আইনসভায় তিনি বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয় এবং পাকিস্তানের সাংবিধানিক কাঠামোতে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
লেখালেখি
আবুল কাসেম ছিলেন বহুমুখী লেখক। তিনি ইসলাম, বিজ্ঞান, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও শিক্ষা নিয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে বিজ্ঞান, সমাজ ও ধর্ম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তিনি প্রায় ১০০টি গ্রন্থ রচনা করেন এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পদার্থবিজ্ঞান ও অন্যান্য বিজ্ঞান বিষয়ে প্রায় ৪০টি পাঠ্যবই লেখেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুরস্কার ও সম্মাননা
সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চায় অবদানের জন্য তিনি ১৯৮২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৭ সালে ভাষা, শিক্ষা ও সমাজে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে একুশে পদক প্রদান করা হয়।
মৃত্যু
মোহাম্মদ আবুল কাসেম ১১ মার্চ ১৯৯১ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা ও বাংলা ভাষার বিকাশে তাঁর অবদান তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে আবুল কাসেমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৭ সালেই তিনি বাংলা ভাষার রাষ্ট্রভাষার মর্যাদার দাবি উত্থাপন করেন এবং তমদ্দুন মজলিশের মাধ্যমে এই দাবিকে সাংগঠনিক রূপ দেন। ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁর উদ্যোগ পরবর্তীকালের ১৯৫২ সালের আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
জানেন কি?
আবুল কাসেমের এমএসসি গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তিনি ১৯৬২ সালে ঢাকায় বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৮১ সাল পর্যন্ত এর অধ্যক্ষ ছিলেন।

