Politician · Bangladesh
কর্নেল আবু তাহের, বীর উত্তম
কর্নেল আবু তাহের ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ১১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার, বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের অন্যতম নেতা। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
Wikimedia Commonsকর্নেল আবু তাহের
জীবনী
জন্ম ও পরিবার
কর্নেল আবু তাহের ১৪ নভেম্বর ১৯৩৮ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আসামের বদরপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার কাজলা গ্রামে। তাঁর পিতা মহিউদ্দিন আহমেদ এবং মা আশরাফুন নেছা। তাঁর স্ত্রী ছিলেন লুত্ফা তাহের। তাঁদের এক মেয়ে ও দুই ছেলে ছিল।
শিক্ষাজীবন
আবু তাহের চট্টগ্রামের ফতেহাবাদ স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৫৯ সালে তিনি সিলেটের এমসি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। সামরিক জীবনে তিনি পাকিস্তানের কোয়েটা স্টাফ কলেজে সিনিয়র ট্যাকটিক্যাল কোর্সেও অংশগ্রহণ করেন।
সামরিক জীবন
আবু তাহের পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭০ সালে তিনি কোয়েটা স্টাফ কলেজে প্রশিক্ষণরত ছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু হলে তিনি এর প্রতিবাদে স্টাফ কলেজ ত্যাগ করেন। একই বছরের জুলাই মাসে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
মুক্তিযুদ্ধের সময় আবু তাহেরকে ময়মনসিংহ এবং রংপুরের একাংশ নিয়ে গঠিত ১১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।
১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর জামালপুরের কামালপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানে আক্রমণ পরিচালনার সময় তিনি গুরুতর আহত হন। তাঁর বাম পা হাঁটুর ওপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গুরুতর আহত হওয়ার পর ভারতে তাঁর চিকিৎসা হয়।
মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করে।
স্বাধীনতার পর সামরিক জীবন
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে আবু তাহের বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসের ৪৪তম ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সরকারের সঙ্গে নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে তিনি ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন।
রাজনৈতিক জীবন
সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর আবু তাহের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটির সহসভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনের পক্ষে সক্রিয় ছিলেন।
৭ নভেম্বর ১৯৭৫
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে একাধিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে। এই অস্থিরতার মধ্যে ৭ নভেম্বর আবু তাহের জাসদের সহযোগিতায় সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এই ঘটনায় তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করা হয়। এরপর দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে।
গ্রেপ্তার ও বিচার
৭ নভেম্বরের ঘটনার পর আবু তাহেরকে ২৪ নভেম্বর ১৯৭৫ গ্রেপ্তার করা হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে একটি সামরিক ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিচার অনুষ্ঠিত হয়। ১৭ জুলাই ১৯৭৬ তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ২১ জুলাই ১৯৭৬ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
বিচার নিয়ে পরবর্তী রায়
পরবর্তীকালে আবু তাহেরের বিচার নিয়ে গুরুতর আইনগত প্রশ্ন ওঠে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ হাইকোর্ট তাঁর সামরিক ট্রাইব্যুনালের বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করে। আদালতের রায়ে সামরিক আইনাধীন ওই বিচারকে ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি বলে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
মৃত্যু ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
আবু তাহের ২১ জুলাই ১৯৭৬ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার, বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা এবং বামপন্থী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে স্মরণীয়।
মুক্তিযুদ্ধে ১১ নম্বর সেক্টরের নেতৃত্ব, কামালপুরের যুদ্ধে গুরুতর আহত হয়ে একটি পা হারানো এবং ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতায় তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁকে একটি আলোচিত ও বিতর্কিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
জানেন কি?
মুক্তিযুদ্ধের সময় কামালপুরের যুদ্ধে আবু তাহের গুরুতর আহত হয়ে বাম পা হারান। এরপরও তিনি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব অব্যাহত রাখেন এবং পরে বীর উত্তম খেতাব লাভ করেন।

