Writer · British Raj
স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী / Sivananda Saraswati
স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী (১৮৮৭–১৯৬৩) ছিলেন একজন ভারতীয় যোগী, আধ্যাত্মিক শিক্ষক, চিকিৎসক ও লেখক। তিনি ১৯৩৬ সালে ঋষিকেশে Divine Life Society প্রতিষ্ঠা করেন এবং যোগ, বেদান্ত, সেবা ও আত্মউপলব্ধির শিক্ষা বিশ্বব্যাপী প্রচার করেন।
Wikimedia Commonsজীবনী
স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী ৮ সেপ্টেম্বর ১৮৮৭ সালে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর পট্টামাদাই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মনাম ছিল কুপ্পুস্বামী। তাঁর বাবা পি. এস. ভেঙ্কু আইয়ার এবং মা পার্বতী আম্মাল ছিলেন ধর্মপরায়ণ পরিবার থেকে। ছোটবেলা থেকেই কুপ্পুস্বামীর মধ্যে মানুষের প্রতি সহানুভূতি, সেবা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি আগ্রহ দেখা যায়।
তিনি তিরুচিরাপল্লির এস.পি.জি. কলেজে পড়াশোনা করেন এবং পরে তাঞ্জোরের মেডিকেল স্কুলে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়ন করেন। চিকিৎসক হিসেবে তিনি মালয়ায় প্রায় দশ বছর কাজ করেন। সেখানে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি তিনি ‘Ambrosia’ নামে একটি চিকিৎসা বিষয়ক পত্রিকাও প্রকাশ করেন।
চিকিৎসক হিসেবে সফল কর্মজীবন থাকা সত্ত্বেও কুপ্পুস্বামীর মনে আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা ক্রমশ গভীর হয়। তিনি পার্থিব জীবন ত্যাগ করে ভারতে ফিরে আসেন এবং ১৯২৪ সালে ঋষিকেশে পৌঁছান। সেখানে স্বামী বিশ্বানন্দের সংস্পর্শে এসে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং ‘স্বামী শিবানন্দ’ নাম লাভ করেন।
ঋষিকেশে তিনি তপস্যা, ধ্যান, যোগসাধনা ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাঁর চারপাশে ধীরে ধীরে শিষ্য ও অনুসারীদের একটি দল গড়ে ওঠে। প্রথমদিকে তাঁরা একটি পরিত্যক্ত গোয়ালঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে এই ছোট আধ্যাত্মিক কেন্দ্রই বিকশিত হয়ে শিবানন্দ আশ্রমে রূপ নেয়।
১৯৩৬ সালে স্বামী শিবানন্দ Divine Life Society প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আধ্যাত্মিক জ্ঞান প্রচার, মানবসেবা এবং মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন। সংগঠনটি ধর্মীয় সংকীর্ণতার পরিবর্তে সত্য, অহিংসা, পবিত্রতা, প্রেম ও নিঃস্বার্থ সেবার মতো সার্বজনীন মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দেয়।
স্বামী শিবানন্দ ‘Yoga of Synthesis’ বা সমন্বিত যোগের ধারণার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তাঁর শিক্ষায় কর্মযোগ, ভক্তিযোগ, জ্ঞানযোগ ও রাজযোগকে পরস্পর সম্পূরক হিসেবে দেখা হয়। তাঁর মতে, মানুষের সামগ্রিক আধ্যাত্মিক বিকাশের জন্য সেবা, ভক্তি, জ্ঞান, ধ্যান ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সমন্বিত অনুশীলন গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি ছিলেন অত্যন্ত prolific লেখক। তাঁর নামে ৩০০টিরও বেশি বই ও গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে যোগ, বেদান্ত, ধ্যান, স্বাস্থ্য, আধ্যাত্মিকতা ও মানবজীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাঁর লেখাগুলো ভারত ও ভারতের বাইরে অসংখ্য সাধক ও পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়।
১৯৪৫ সালে তিনি All World Religions Federation প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৪৮ সালে Yoga-Vedanta Forest Academy প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর উদ্যোগে প্রকাশনা, চিকিৎসাসেবা, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও দরিদ্রদের সহায়তাসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমও বিস্তৃত হয়।
স্বামী শিবানন্দের মূল বার্তাগুলোর মধ্যে ছিল মানবসেবা, ঈশ্বরপ্রেম, ধ্যান, আত্মজ্ঞান ও নিঃস্বার্থ কর্ম। তাঁর বহুল পরিচিত আদর্শ ছিল—“Serve, Love, Meditate, Realize”—অর্থাৎ সেবা করা, ভালোবাসা, ধ্যান করা এবং আত্মউপলব্ধি অর্জন করা।
১৪ জুলাই ১৯৬৩ সালে ঋষিকেশের গঙ্গাতীরে শিবানন্দ আশ্রমে তিনি মহাসমাধি লাভ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্যরা Divine Life Society ও তাঁর আধ্যাত্মিক শিক্ষার প্রচার অব্যাহত রাখেন। আজও তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ও রচনাবলি বিশ্বজুড়ে যোগ, বেদান্ত ও আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।
জানেন কি?
জানেন কি, স্বামী শিবানন্দ সরস্বতী সন্ন্যাস গ্রহণের আগে প্রায় এক দশক মালয়ায় চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং পরে ১৯৩৬ সালে ঋষিকেশে Divine Life Society প্রতিষ্ঠা করেন।



