Economist, Social Entrepreneur · Bangladesh
মুহাম্মদ ইউনূস
মুহাম্মদ ইউনূস (জন্ম ১৯৪০) — গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও ক্ষুদ্রঋণের পথিকৃৎ, ২০০৬-এ শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রথম বাংলাদেশি; ২০২৪-এর আগস্ট থেকে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।
Wikimedia Commonsমুহাম্মদ ইউনূস — অর্থনীতির অধ্যাপক, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা, আর বাংলাদেশের প্রথম নোবেল বিজয়ী: ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল, ক্ষুদ্রঋণের ধারণার জন্য, গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে। ২০২৪-এর আগস্ট থেকে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা — চুরাশি বছর বয়সে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব।
কর্মজীবনের সময়রেখা
- 1940
২৮ জুন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বাথুয়া গ্রামে জন্ম; বাবা দুলা মিয়া সওদাগর, মা সুফিয়া খাতুন
- 1965
ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে; ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পিএইচডি
- 1969
মিডল টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক (১৯৭২ পর্যন্ত)
- 1971
মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক কমিটি গঠন ও বাংলাদেশ ইনফরমেশন সেন্টার পরিচালনা
- 1972
দেশে ফিরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগদান, পরে বিভাগীয় প্রধান; ১৯৭৫–৮৯ অধ্যাপক
- 1974
দুর্ভিক্ষের বছরে জোবরা গ্রামে ৪২ জন মহিলাকে নিজের টাকা থেকে মোট ৮৫৬ টাকা ঋণ — ক্ষুদ্রঋণের সূচনা
- 1976
জোবরায় ক্ষুদ্রঋণের পাইলট প্রকল্প শুরু
- 1983
১ অক্টোবর অধ্যাদেশে গ্রামীণ ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু
- 1984
র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার
- 1987
পল্লী উন্নয়নে স্বাধীনতা পুরস্কার
- 1996
৩ এপ্রিল – ২৩ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা (প্রাথমিক ও গণশিক্ষা; পরিবেশ ও বন; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি)
- 2006
গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার — প্রথম বাংলাদেশি নোবেল বিজয়ী
- 2007
১৮ ফেব্রুয়ারি 'নাগরিক শক্তি' নামে রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা; মে মাসে সে পরিকল্পনা প্রত্যাহার
- 2009
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম; পরের বছর কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল
- 2011
২ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অপসারণ; হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ, পদ ফেরেনি
- 2024
১ জানুয়ারি শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় ছ'মাসের কারাদণ্ড, আপিলে জামিন; ৭ আগস্ট সাজা বাতিল
- 2024
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর ছাত্র আন্দোলনের প্রস্তাবে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ
- 2026
সাধারণ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার মেয়াদ শেষ; উত্তরসূরি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান; ২৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি বাসভবন ত্যাগ
জীবনী
হাটহাজারী থেকে ভ্যান্ডারবিল্ট
জন্ম ২৮ জুন ১৯৪০, চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বাথুয়া গ্রামে। বাবা দুলা মিয়া সওদাগর ছিলেন জহুরি, মা সুফিয়া খাতুন; চোদ্দো সন্তানের মধ্যে যে ন'জন বেঁচে ছিলেন, ইউনূস তাঁদের তৃতীয়। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকে পূর্ব পাকিস্তানে ষোড়শ স্থান; চট্টগ্রাম কলেজ, তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি। ১৯৬৫-তে ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে — ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পিএইচডি, আর ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ মিডল টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে বসে তিনি নাগরিক কমিটি গড়েন ও বাংলাদেশ ইনফরমেশন সেন্টার চালান।
জোবরা গ্রাম আর ৮৫৬ টাকা
দেশে ফিরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগ দেন, পরে বিভাগীয় প্রধান; ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত অধ্যাপক। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের জোবরা গ্রামে তিনি দেখেন, বাঁশের আসবাব বানানো মেয়েরা কাঁচামাল কিনতে মহাজনের কাছে এমন সুদে ঋণ নেন যে লাভের পুরোটাই সুদে চলে যায়। নিজের পকেট থেকে ৪২ জন মহিলাকে মোট ৮৫৬ টাকা ধার দেন — এই পরীক্ষা থেকেই ক্ষুদ্রঋণের ধারণা। ১৯৭৬-এ জোবরায় পাইলট প্রকল্প, ১৯৮২-তে সদস্য ২৮ হাজার, আর ১ অক্টোবর ১৯৮৩ অধ্যাদেশে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু গ্রামীণ ব্যাংকের — জামানত ছাড়া ঋণ, আর ঋণগ্রহীতাদের ছোট দলের পারস্পরিক দায়ে পরিশোধ।
পরের দশকগুলোতে গ্রামীণ ছড়ায় বহু প্রতিষ্ঠানে — গ্রামীণ টেলিকম, যার অংশীদারিত্ব আছে দেশের বৃহত্তম মোবাইল কোম্পানি গ্রামীণফোনে। ১৯৯৭ থেকে ২০০৭-এর মধ্যে "পল্লী ফোন" প্রকল্পে পঞ্চাশ হাজারের বেশি গ্রামে মোবাইল পৌঁছয়। স্বীকৃতিও আসে ধারাবাহিকভাবে: ১৯৮৪-তে র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার, ১৯৮৭-তে পল্লী উন্নয়নে স্বাধীনতা পুরস্কার, ১৯৯৪-এ ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ, ১৯৯৮-এ সিডনি শান্তি পুরস্কার ও ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার। ১৯৯৬-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারে প্রায় তিন মাস উপদেষ্টা — এটাই সরকারে তাঁর প্রথম দায়িত্ব।
নোবেল, রাজনীতি, আদালত
২০০৬-এ শান্তিতে নোবেল — গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে, "নিচ থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের" প্রচেষ্টার জন্য। পরের বছর, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৭, তিনি "নাগরিক শক্তি" নামে রাজনৈতিক দল গড়ার ঘোষণা দেন, আর মে মাসেই সে পথ থেকে সরে আসেন। যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে দেয় ২০০৯-এ প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম আর ২০১০-এ কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল।
২ মার্চ ২০১১ বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে তাঁকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে সরানো হয়; তিনি হাইকোর্টে সিদ্ধান্তটি চ্যালেঞ্জ করেন, কিন্তু পদ ফিরে পাননি। ২০১৩-র গ্রামীণ ব্যাংক আইনে ব্যাংকের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ে। ১ জানুয়ারি ২০২৪ শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় ঢাকার একটি আদালত তাঁকে ছ'মাসের কারাদণ্ড দেয় — গ্রামীণ টেলিকমের তিন কর্মকর্তাসহ; তিনি আপিলে জামিনে থাকেন। ৭ আগস্ট ২০২৪ আপিলে সেই সাজা বাতিল হয়।
প্রধান উপদেষ্টা
২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ইউনূসের নাম প্রস্তাব করে; রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন সম্মতি দেন, আর ৮ আগস্ট ২০২৪ তিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। তাঁর সরকার সংবিধান সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে এবং ২০২৬-এর সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করে। নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তাঁর মেয়াদ শেষ হয়; উত্তরসূরি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি সরকারি বাসভবন ছাড়েন।
স্ত্রী আফরোজী ইউনূস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক; মেয়ে দিনা আফরোজ ইউনূস। প্রথম স্ত্রী ভেরা ফরোস্তেঙ্কোর ঘরে মেয়ে মনিকা ইউনূস। তাঁর বইয়ের মধ্যে আছে Banker to the Poor আর A World of Three Zeros।
জানেন কি?
গ্রামীণ ব্যাংকের শুরু ৪২ জন মহিলাকে দেওয়া মোট ৮৫৬ টাকার ঋণ থেকে — ১৯৭৪ সালে, জোবরা গ্রামে, ইউনূসের নিজের পকেট থেকে। ব্যাংক হিসেবে যাত্রা তার ন'বছর পর, ১৯৮৩-তে।
সাধারণ প্রশ্ন
গ্রামীণ ব্যাংক কীভাবে শুরু হয়েছিল?
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের জোবরা গ্রামে ইউনূস দেখেন, বাঁশের আসবাব বানানো মেয়েরা মহাজনের চড়া সুদে কাঁচামাল কিনতে বাধ্য। তিনি নিজের টাকা থেকে ৪২ জনকে মোট ৮৫৬ টাকা ধার দেন। ১৯৭৬-এ পাইলট প্রকল্প, আর ১৯৮৩ সালের ১ অক্টোবর অধ্যাদেশে গ্রামীণ ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করে — জামানত ছাড়া ছোট ঋণ, ঋণগ্রহীতাদের দলের পারস্পরিক দায়ে পরিশোধ।
মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার পান কবে, কী জন্য?
২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল — গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে নিচ থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের প্রচেষ্টার জন্য। তিনিই প্রথম বাংলাদেশি নোবেল বিজয়ী।
তিনি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা হলেন কীভাবে?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে তাঁর নাম প্রস্তাব করে; রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন সম্মতি দেন এবং ৮ আগস্ট ২০২৪ তিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তাঁর মেয়াদ শেষ হয়; উত্তরসূরি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গ্রামীণ ব্যাংক থেকে তাঁকে সরানো হয়েছিল কেন?
২০১১ সালের ২ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে তাঁকে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। তিনি সিদ্ধান্তটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন, কিন্তু পদ ফিরে পাননি। ২০১৩ সালের গ্রামীণ ব্যাংক আইনে ব্যাংকের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তাঁর কারাদণ্ড হয়েছিল কেন?
গ্রামীণ টেলিকমে শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকার একটি আদালত তাঁকে ও প্রতিষ্ঠানটির তিন কর্মকর্তাকে ছ'মাসের কারাদণ্ড দেয়; তিনি আপিলে জামিনে থাকেন। ৭ আগস্ট ২০২৪ আপিলে সাজাটি বাতিল হয়, এবং কয়েক দিন পর দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলা থেকেও তিনি খালাস পান।
মুহাম্মদ ইউনূসের লেখা বই কী কী?
সবচেয়ে পরিচিত 'Banker to the Poor' — গ্রামীণ ব্যাংকের গল্প তাঁর নিজের ভাষায়; এরপর 'Creating a World Without Poverty', 'Building Social Business' আর 'A World of Three Zeros' — সামাজিক ব্যবসা ও শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন নিঃসরণের ধারণা নিয়ে।